প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ভাষা, সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন তরুণ রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যে যে ভাষা ও উপস্থাপনা দেখা যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। তাঁর দাবি, এসব বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়কার রাজনৈতিক ‘অপসংস্কৃতির’ প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই রক্তাক্ত: স্মরণ ও প্রত্যয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী এসব মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি, ছাত্রদল এবং সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, অশালীন ভাষা কিংবা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ব্যবহার করা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। তাঁর ভাষায়, রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবে, বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সেই বিতর্ক হওয়া উচিত শালীনতা ও যুক্তির ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়মিত মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের অভিযোগ ছিল। বিএনপি শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘খুনি’ বলে রাজনৈতিক সমালোচনা করেছে, কিন্তু ব্যক্তিগত বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করেনি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ভাষা এমন হওয়া উচিত, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে শক্তিশালী করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
রিজভী বলেন, ঘৃণা, প্রতিহিংসা কিংবা বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। তিনি দাবি করেন, ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটেছে এবং এই অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকা উচিত। তাঁর মতে, অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না করে নতুন নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে আরও দায়িত্বশীল ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
আলোচনা সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও মন্তব্য করেন রিজভী। তিনি অভিযোগ করেন, দলটি একটি পশ্চাৎমুখী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোট করেছে, যা তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত প্রগতিশীল চিন্তাধারা ও ভবিষ্যতমুখী রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
তিনি বলেন, তরুণদের রাজনীতিতে আসার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নতুন ধারণা, নতুন নীতি এবং জনগণের জন্য কার্যকর পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা। পুরোনো বিভাজন ও সংঘাতের রাজনীতি নয়, বরং উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং জবাবদিহিতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রুহুল কবির রিজভী বলেন, তাঁর দলের দৃষ্টিতে এই আন্দোলন ছিল দীর্ঘ সময় ধরে চলা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের চূড়ান্ত প্রকাশ। তিনি দাবি করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান সেই আন্দোলনের ভিত্তি শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছিল।
এ সময় তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর দাবি, ক্ষমতা ধরে রাখতে কঠোর দমন-পীড়ন, গুলি এবং বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অতীতে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রশাসনে নিয়োগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশেই প্রচলিত একটি প্রক্রিয়া। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘স্পয়েলস সিস্টেম’-এর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, নির্বাচনের পর নতুন প্রশাসন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়, যা অনেক দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।
তবে তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে প্রশাসনে সবচেয়ে বড় ধরনের দলীয়করণ ঘটতে পারে। তাঁর এই মন্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনও। তিনি ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি এবং সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ‘ফিমেল কর্নার’ চালুর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, নারী নিরাপত্তার নামে কিছু উদ্যোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নাছির উদ্দীন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, নাসীরুদ্দীন ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে অশালীন ও তির্যক মন্তব্য করছেন, যা রাজনৈতিক সৌজন্যের পরিপন্থী। এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের কর্মকাণ্ড নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন নাছির উদ্দীন। তাঁর বক্তব্যে কিছু কড়া মন্তব্যও উঠে আসে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন দল ও নেতাদের বক্তব্যে ভাষার ব্যবহার, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার যুগে নেতাদের ভাষা ও বক্তব্য জনমনে দ্রুত প্রভাব ফেলছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যতই তীব্র হোক, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা সব পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের অভিমত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত বিরোধ স্বাভাবিক হলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা কিংবা উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে নীতিনির্ভর বিতর্কের পরিবেশ গড়ে তোলা দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।