জুলাইয়ে ২২% বিক্রি বাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে বিওয়াইডি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) শিল্পে প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, চীনের শীর্ষ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি (BYD) ততই নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে কোম্পানিটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি যানবাহন বিক্রি করেছে। বৈশ্বিক বাজারে বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির চাহিদা বৃদ্ধি, নতুন মডেলের জনপ্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের কৌশলগত পদক্ষেপ বিওয়াইডির এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে যখন বিভিন্ন নির্মাতা উৎপাদন ব্যয়, শুল্কনীতি এবং বাজার প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে, তখন বিওয়াইডির ধারাবাহিক বিক্রিবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানটির বাজার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রতিফলন।

জুলাই মাসের বিক্রির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোম্পানিটি দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিওয়াইডির উপস্থিতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এসব অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব পরিবহনের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনা এবং চার্জিং অবকাঠামোর উন্নয়ন বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিওয়াইডি বর্তমানে শুধু সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়িই নয়, প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রযুক্তির যানবাহনও উৎপাদন করছে। এই কৌশল কোম্পানিকে এমনসব বাজারেও প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে, যেখানে চার্জিং নেটওয়ার্ক এখনও পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে গ্রাহকেরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ—দুই ব্যবস্থার সুবিধা একসঙ্গে পাওয়ায় এসব গাড়ির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বিওয়াইডির উত্থান গত কয়েক বছরে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। একসময় প্রধানত ব্যাটারি নির্মাতা হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহন প্রস্তুতকারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, নিজস্ব ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কোম্পানিটিকে প্রতিযোগীদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিওয়াইডির অন্যতম শক্তি হলো এর উল্লম্বভাবে সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা। ব্যাটারি, মোটর, ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে শুরু করে গাড়ির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ প্রতিষ্ঠানটি নিজেরাই উৎপাদন করে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা কমে এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।

চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার এখনও বিওয়াইডির সবচেয়ে বড় ভিত্তি। বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার হিসেবে চীনে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের নীতিগত সহায়তা, চার্জিং অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দেশটির ইভি শিল্পকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে।

তবে শুধু চীনের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বিওয়াইডি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন ডিলারশিপ, উৎপাদন সুবিধা এবং বিক্রয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে ব্রাজিল, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন বাজারে কোম্পানিটি নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত সম্প্রসারণ বিওয়াইডির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের অনেক দেশে এখন অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত গাড়ির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে নতুন বাজারে আগেভাগে অবস্থান তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে কোম্পানির বিক্রি আরও বাড়তে পারে।

অবশ্য বিওয়াইডির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কয়েকটি দেশে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের আলোচনা চলছে। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য রক্ষার যুক্তিতে বিভিন্ন সরকার নীতিগত পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করছে। এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা নির্মাতাদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে মূল্য প্রতিযোগিতাও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাজার দখলের লক্ষ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান গাড়ির দাম কমাচ্ছে, যার প্রভাব মুনাফার ওপর পড়তে পারে। তবুও বিওয়াইডি উৎপাদন দক্ষতা এবং নিজস্ব প্রযুক্তির কারণে তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বর্তমানে বিওয়াইডির অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের টেসলা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের একাধিক নির্মাতা, যেমন নিও, এক্সপেং, লিপমোটর এবং জিকরও নতুন প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের মাধ্যমে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বিওয়াইডির সাফল্যের পেছনে শুধু বিক্রির পরিমাণ নয়, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিষ্ঠানটি উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি, দ্রুত চার্জিং সুবিধা, স্মার্ট ড্রাইভিং সিস্টেম এবং সফটওয়্যারভিত্তিক ফিচারের উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করছে। এসব উদ্যোগ গ্রাহকদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিবেশ নীতিতেও বৈদ্যুতিক যানবাহনের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ কার্বন নিঃসরণ কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পরিবহনের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার উৎসাহিত করছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিওয়াইডির মতো নির্মাতাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও চার্জিং অবকাঠামো, আমদানি নীতি এবং মূল্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এ বাজারেও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানিচালিত গাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির দিকে এই পরিবর্তন শুধু শিল্পখাত নয়, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং পরিবেশ নীতিতেও বড় প্রভাব ফেলছে। বিওয়াইডির মতো প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতিফলন।

জুলাই মাসে ২২ শতাংশ বিক্রি বৃদ্ধি বিওয়াইডির জন্য শুধু একটি মাসিক সাফল্য নয়; বরং এটি বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও ইঙ্গিত বহন করছে। সামনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, শুল্কনীতি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিওয়াইডি বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত