ভারতে স্থলপথে রপ্তানি বন্ধে সংকটে পাবনার হোসিয়ারিশিল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারিশিল্পের কেন্দ্র পাবনা নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে হোসিয়ারি পণ্য রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলার শত শত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং হাজারো শ্রমিকের জীবিকায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে স্থলপথে পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই প্রবাহ থেমে যাওয়ায় উৎপাদন, বিপণন এবং রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভারতের বাজার পাবনার হোসিয়ারিশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ গেঞ্জি, টি-শার্ট, আন্ডারগার্মেন্টস, মোজা, শিশুদের পোশাক এবং অন্যান্য নিট পণ্য স্থলপথে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রপ্তানি হতো। কম পরিবহন ব্যয়, দ্রুত ডেলিভারি এবং সীমান্তবর্তী বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার থাকায় ব্যবসায়ীরা এই পথকে সবচেয়ে কার্যকর মনে করতেন। কিন্তু স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সুবিধা এক ধাক্কায় হারিয়ে গেছে।

পাবনার হোসিয়ারিশিল্প কয়েক দশক ধরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত হিসেবে পরিচিত। জেলার অসংখ্য ছোট, মাঝারি ও বড় কারখানায় তৈরি পোশাক দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়। এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সুতা, রং, প্যাকেজিং, পরিবহন এবং পাইকারি বিপণনের বিস্তৃত অর্থনৈতিক কার্যক্রম। ফলে রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব শুধু কারখানা মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শ্রমিক, পরিবহন ব্যবসায়ী, কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও।

রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার ফলে এখন বিকল্প হিসেবে সমুদ্র বা আকাশপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু এসব পথে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেশি এবং সময়ও তুলনামূলক দীর্ঘ। এতে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় ক্রেতারাও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বড় রপ্তানিকারকদের তুলনায় তাদের পুঁজির সক্ষমতা সীমিত। দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য গুদামে আটকে থাকলে কিংবা বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হলে তারা আর্থিকভাবে বড় চাপের মুখে পড়েন। ইতোমধ্যে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নতুন অর্ডার গ্রহণেও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

শিল্পমালিকদের মতে, ভারতের বাজারে বাংলাদেশের হোসিয়ারি পণ্যের একটি স্থায়ী চাহিদা রয়েছে। মানসম্মত পণ্য, প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল শক্তিশালী। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সেই বাজার অন্য দেশের প্রতিযোগীরা দখল করে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলছেন, রপ্তানি কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ শ্রমিকেরা। উৎপাদন কমে গেলে অতিরিক্ত সময়ের কাজ কমে যায়, অনেক ক্ষেত্রে মজুরি কমে আসে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়। পাবনা জেলার বহু পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল রপ্তানি কাঠামো সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। সীমান্ত নীতি, শুল্ক ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হলে ব্যবসা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যময় করা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্রুত আলোচনা প্রয়োজন। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে এমন একটি সমাধান বের করা জরুরি, যাতে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরাই ক্ষতির মুখে না পড়েন।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, স্থলপথে বাণিজ্য শুধু পরিবহন ব্যয় কমায় না, বরং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করে। বিশেষ করে পোশাক ও হোসিয়ারি পণ্যের মতো মৌসুমি এবং চাহিদানির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে সময়মতো ডেলিভারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকে যেতে পারেন।

পাবনার হোসিয়ারিশিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা হাজারো উৎপাদন ইউনিট স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখার পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। ফলে শিল্পটির বর্তমান সংকট শুধু একটি বাণিজ্যিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা সরকারের কাছে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা জোরদার করা, বিকল্প রপ্তানি করিডোর সহজ করা, পরিবহন ব্যয় কমাতে বিশেষ সহায়তা দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে।

অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং রপ্তানিকারকদের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত এখনো জানানো হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের রপ্তানি নীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। শুধু একটি বা দুটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি অবকাঠামো, সীমান্ত বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিক সুবিধার উন্নয়নও সময়ের দাবি।

পাবনার হোসিয়ারিশিল্প বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দেশের অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তাই শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দুই দেশের মধ্যে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত স্থলপথে রপ্তানি স্বাভাবিক হবে এবং শিল্পটি আবারও আগের গতিতে ফিরে আসতে পারবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত