তিন বছরে সর্বোচ্চ পাট রপ্তানি, ফিরছে কি সোনালি দিনের আশা?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা কয়েক বছর ধরে নিম্নমুখী থাকার পর বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি খাতটির প্রকৃত সক্ষমতার প্রতিফলন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, রপ্তানির আর্থিক মূল্য বাড়লেও পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বরং কাঁচা পাটের মূল্যবৃদ্ধিই রপ্তানি আয়ের পরিমাণ বাড়ানোর প্রধান কারণ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮৮ কোটি মার্কিন ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। এটি গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় হলেও করোনা মহামারির সময়কার রেকর্ড এখনও অনেক দূরের পথ।

২০২০–২১ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল, যা প্রায় দেড় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের কারণে টানা চার বছর রপ্তানি কমতে থাকে। সর্বশেষ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি তাই খাতটির জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।

তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধিকে অতিরিক্ত আশাবাদের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি মূলত কাঁচা পাটের উচ্চমূল্যের প্রভাব। গত বছরের বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে কাঁচা পাটের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পাটপণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি মূল্যের ওপর।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) নেতাদের মতে, এক বছর আগেও প্রতি মণ কাঁচা পাটের দাম যেখানে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার মধ্যে ছিল, সেখানে সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে পাঁচ হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে একই পণ্যের রপ্তানি মূল্যও বেড়েছে। অর্থাৎ ডলারের হিসাবে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত রপ্তানি পরিমাণে সেই অনুপাতে প্রবৃদ্ধি হয়নি।

পরিসংখ্যানেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিদায়ী অর্থবছরে পাটের সুতা রপ্তানি মূল্য প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছালেও পরিমাণের দিক থেকে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। একইভাবে কাঁচা পাটের রপ্তানি মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও রপ্তানিকৃত পাটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কাঁচামালের উচ্চমূল্য স্বল্পমেয়াদে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে নিতে পারেন, ফলে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট, পাটের সুতা, বস্তা এবং বিভিন্ন ধরনের বহুমুখী পাটপণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া এবং ইরান বাংলাদেশের পাটপণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছু বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে বহুমুখী পাটপণ্যের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ অর্থবছরে এই খাতের রপ্তানি প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইউরোপীয় বাজারে ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে নতুন ক্রয়াদেশ কমে গেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বহুমুখী পাটপণ্যেই নিহিত। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের তৈরি শপিং ব্যাগ, গৃহসজ্জার সামগ্রী, ফ্যাশন পণ্য, প্যাকেজিং উপকরণ, জিও-টেক্সটাইল, অটোমোবাইল শিল্পে ব্যবহৃত উপাদান এবং কৃষিখাতে ব্যবহৃত পাটজাত সামগ্রীর আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এ ছাড়া পাটকাঠি থেকে উৎপাদিত চারকোল, পরিবেশবান্ধব কম্পোজিট উপাদান এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পাটপণ্যেরও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও এই বাজারের বড় অংশ দখল করতে পারেনি।

খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করেন, শুধু পাটের সুতা ও বস্তার ওপর নির্ভরশীল থাকলে কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি আয় অর্জন সম্ভব নয়। উচ্চ মূল্য সংযোজনের বহুমুখী পণ্য উৎপাদন বাড়াতে না পারলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। এজন্য নতুন পণ্য উদ্ভাবন, গবেষণা, নকশা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি ভবিষ্যতে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাঁচামালের স্থিতিশীল সরবরাহ, উন্নত প্রযুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও প্রাকৃতিক তন্তুভিত্তিক বৈশ্বিক শিল্পে দেশের সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। প্রতিবছর প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হলেও সেই কাঁচামালের বড় অংশ এখনও স্বল্প মূল্য সংযোজিত পণ্য হিসেবে রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই কাঁচামাল দিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশে পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে বিশ্বের বড় বাজারগুলো ঝুঁকছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের পাটশিল্প নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, যদি উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলে আধুনিকায়ন আনা যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রপ্তানিতে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে কাঁচা পাটের সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল করা, বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো, গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই একসময় দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত ‘সোনালি আঁশ’ আবারও বৈদেশিক বাণিজ্যে তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত