দাম বাড়ায় ব্যবহৃত গ্যাজেটের বাজারে বাড়ছে ভিড়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ক্যামেরার দাম এখন অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ডিভাইস কিনতে গেলে প্রয়োজন হচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক ক্রেতা এখন ঝুঁকছেন ব্যবহৃত বা সেকেন্ড-হ্যান্ড গ্যাজেটের বাজারে।

রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে ব্যবহৃত আইফোন খুঁজছিলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রফিক আহমেদ। নতুন আইফোন কেনার সামর্থ্য না থাকায় তিনি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবহৃত আইফোন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রফিকের ভাষায়, নতুন ফোনের তুলনায় ব্যবহৃত ডিভাইস প্রায় অর্ধেক দামে পাওয়া যায়, অথচ অনেক সময় এর পারফরম্যান্স কাছাকাছি থাকে। তাই সীমিত বাজেটের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে তাঁর বাবা আবদুস সোবহানের মনে রয়েছে কিছুটা শঙ্কা। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই অভিভাবক বলেন, নতুন পণ্য কেনার নিরাপত্তা থাকলেও ব্যবহৃত গ্যাজেট কেনার ক্ষেত্রে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফোনটি ভালো থাকবে কি না, কিছুদিন পর নষ্ট হলে কী হবে—এসব বিষয় নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।

এই আর্থিক সুবিধা ও ঝুঁকির সমীকরণই বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স বাজারকে দ্রুত বড় করছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্সের বাজার কয়েক হাজার কোটি ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। নতুন প্রযুক্তিপণ্যের দাম বৃদ্ধি, চিপ সংকট এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে বাজেট সচেতন ক্রেতাদের কাছে পুরোনো ডিভাইসের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য বিক্রির কেন্দ্র, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ফোন, ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশের কেনাবেচা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বসুন্ধরা সিটির ব্যবহৃত ফোন বিক্রেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বর্তমানে আইফোন ও স্যামসাংয়ের উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাঁর দোকানে নতুন ও ব্যবহৃত—দুই ধরনের ফোন বিক্রি হয়।

তিনি বলেন, বিক্রির আগে ব্যবহৃত ফোনগুলো বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। ব্যাটারি, ডিসপ্লে, ক্যামেরা, মাদারবোর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশ যাচাই করার পরই বিক্রির জন্য রাখা হয়। অনেক দোকান এখন গ্রাহকদের আস্থা বাড়াতে সীমিত সময়ের রিপ্লেসমেন্ট সুবিধাও দিচ্ছে।

মামুন জানান, ভালো অবস্থার একটি ব্যবহৃত আইফোন বা ফ্ল্যাগশিপ ফোন অনেক সময় মূল দামের বড় একটি অংশ ধরে রাখতে পারে। ব্যাটারি হেলথ ভালো থাকলে এবং ফোনের বাহ্যিক অবস্থা ঠিক থাকলে ক্রেতারা সেটিকে নতুনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন।

ব্যবহৃত প্রযুক্তিপণ্যের বাজার বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুক মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ সহজ হয়েছে।

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম ফেসবুক মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে ব্যবহৃত এসএসডি ও র‍্যাম কিনেছেন। তাঁর মতে, নতুন কম্পিউটার যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবহৃত পণ্য কেনাই বর্তমানে অনেকের জন্য বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

রাজধানীর নিউ এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান কম্পিউটার সিটি সেন্টারেও ব্যবহৃত ল্যাপটপের চাহিদা বেড়েছে। শিক্ষার্থী ও সীমিত আয়ের চাকরিজীবীরা কম খরচে প্রয়োজনীয় ডিভাইস কিনতে সেখানে যাচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিলয় বিশ্বাস জানান, পড়াশোনার জন্য একটি ল্যাপটপ প্রয়োজন হলেও নতুন ল্যাপটপ কেনার বাজেট তাঁর ছিল না। তাই পুরোনো ল্যাপটপ কেনার আগে অনলাইনে বিভিন্ন যাচাই পদ্ধতি দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

শুধু ফোন বা ল্যাপটপ নয়, ক্যামেরার বাজারেও ব্যবহৃত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকার ক্যামেরা মার্কেটে নতুন ক্যামেরার পাশাপাশি ব্যবহৃত ক্যামেরা, লেন্স ও ফটোগ্রাফি সরঞ্জামের বড় বাজার তৈরি হয়েছে।

ক্যামেরা বিক্রেতারা বলছেন, নতুন একটি ভালো মানের ক্যামেরা কিনতে যেখানে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে, সেখানে ব্যবহৃত একই ধরনের ক্যামেরা অনেক কম দামে পাওয়া যায়। ফলে নতুন ফটোগ্রাফারদের জন্য ব্যবহৃত ক্যামেরা শেখার ও কাজ শুরু করার সুযোগ তৈরি করছে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবহৃত গ্যাজেট কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ কম দাম মানেই ভালো চুক্তি নয়। অনেক সময় মেরামত করা, নকল যন্ত্রাংশ যুক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত ডিভাইসও বাজারে বিক্রি হয়।

স্যামসাংয়ের সাবেক সফটওয়্যার প্রকৌশলী মুহাম্মদ সামী ব্যবহৃত ডিভাইস কেনার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, অনুমোদিত দোকান থেকে কেনা নতুন ডিভাইসের মান যাচাই করা থাকে, কিন্তু ব্যবহৃত পণ্যের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ব্যবহার, মেরামতের ইতিহাস বা ভেতরের পরিবর্তন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবহৃত ডিভাইস কেনার আগে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ব্যাটারি, ডিসপ্লে, ক্যামেরা, চার্জিং পোর্ট, স্পিকার, সফটওয়্যার সাপোর্ট এবং ডিভাইসের পূর্ববর্তী ব্যবহারের ইতিহাস যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে ব্যাটারি স্বাস্থ্য, সফটওয়্যার আপডেট সুবিধা এবং পরিচিত সমস্যা সম্পর্কে আগে থেকে জানা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পুরোনো ডিভাইসে সফটওয়্যার আপডেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে ব্যবহৃত গ্যাজেটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এটি শুধু অর্থ সাশ্রয় করে না, পরিবেশের জন্যও তুলনামূলকভাবে উপকারী। একটি ডিভাইস দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা গেলে ই-বর্জ্যের পরিমাণ কমে।

বর্তমান সময়ে নতুন প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় ব্যবহৃত গ্যাজেটের বাজার আরও বড় হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই বাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের সচেতনতা।

কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যবহৃত গ্যাজেট কেনার মূল প্রশ্ন একটাই—কম দামে কেনা ডিভাইসটি কতদিন ভালোভাবে ব্যবহার করা যাবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত