দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ সইয়ের পথে বাংলাদেশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট-সিইপিএ) এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের দর-কষাকষি ও কারিগরি আলোচনা শেষ হওয়ার পর আইনি ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই দুই দেশ শিগগিরই চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই চুক্তি শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দক্ষিণ কোরিয়ার সফররত বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কুর সম্মানে আয়োজিত এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক গত কয়েক দশকে উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত সংযোগ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সিইপিএ চুক্তি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। নৈশভোজ শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সিইপিএ নিয়ে দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া অল্প কয়েক দশকের মধ্যেই শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, রপ্তানি এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়েছে, তা বিশ্বের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় সেই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়েছে এবং বর্তমানে তা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি শিল্প উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং যৌথ সমৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার একটি অংশ কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে সিইপিএ চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, সিইপিএ কেবল শুল্ক সুবিধা অর্জনের একটি চুক্তি নয়; বরং এটি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্প সহযোগিতা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করার মতো বহুমাত্রিক সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি আলোচনায় অংশ নেওয়া দুই দেশের কর্মকর্তা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, আলোচক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অবদানের প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু বাংলাদেশের প্রতি তার ব্যক্তিগত আবেগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশকে নিজের ‘দ্বিতীয় শহর’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অতীতে চট্টগ্রামে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বিশাল ভোক্তা বাজার, তরুণ কর্মশক্তি এবং শিল্প সম্ভাবনা দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সিইপিএ চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা একটি স্থিতিশীল এবং পূর্বানুমানযোগ্য আইনি কাঠামোর মধ্যে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প বিনিয়োগ বাড়বে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী দুই দশকের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে এই চুক্তি কাজ করবে। তিনি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে সিইপিএর সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে নতুন বাজার, যৌথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার। তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়লে ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সংখ্যা বাড়াতে হবে। সিইপিএ সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারেই নয়, পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কেও আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা, চুক্তি কার্যকর হলে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমবে, পণ্য রপ্তানির সময় ও ব্যয় হ্রাস পাবে, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং বিনিয়োগ সুরক্ষার নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে যৌথ শিল্পাঞ্চল, প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির পথও আরও প্রশস্ত হবে।

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ যখন নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সন্ধান করছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত