প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিকে ঘিরে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও অন্যান্য শ্রমঘন শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও প্রায় একই ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আপাতত খুব বেশি পরিবর্তিত হচ্ছে না। তবে শুল্ক বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও শিল্প উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে আগে থেকেই বিদ্যমান গড় ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্কের সঙ্গে নতুন ১০ শতাংশ যুক্ত হয়ে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মোট শুল্কভার দাঁড়াবে প্রায় ২৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়; বরং একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক বাণিজ্য কৌশলের অংশ। ওয়াশিংটনের দাবি, যেসব দেশে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেসব দেশের পণ্যের ওপর এই অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমমান উন্নয়ন এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত শুল্ক এককভাবে আরোপ করা হয়নি। ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের ওপরও একই হারে ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, চীন, ব্রাজিল, তুরস্ক, মিসরসহ কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে শুল্কহার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে খুব বেশি দুর্বল হচ্ছে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বড় অংশই একই ধরনের অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় এসেছে।
রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন আদালতের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন প্রথম দফায় ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছিল। সেই শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবার একই পরিমাণ নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। ফলে কার্যত শুল্কের হার বাড়েনি, তবে অনিশ্চয়তা দূর হয়নি।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বর্তমান শুল্ক কাঠামোর চেয়ে ভবিষ্যতের তদন্তগুলো বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদন সক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার, অতিরিক্ত উৎপাদন এবং শ্রমমান সম্পর্কিত তদন্তের ফলাফল যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে প্রায় ৯০৪ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও কাছাকাছি মাত্রার শুল্ক আরোপ হওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে না। তবে অতিরিক্ত শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বাড়লে মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। এর প্রভাব সব রপ্তানিকারক দেশের মতো বাংলাদেশের ওপরও পড়বে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। কারণ, পরে মার্কিন আদালত আগের পাল্টা শুল্ক বাতিল করলেও নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে একই ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে। ফলে আগের চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে এ ধরনের শুল্ক আরোপ বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য ন্যায়সংগত নয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে আন্তর্জাতিক শ্রমমান নিশ্চিত করতে গত এক দশকে ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। ফলে নতুন এই শুল্কের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তিনি বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও একই ধরনের শুল্ক থাকায় বাজার হারানোর ঝুঁকি আপাতত সীমিত। তবে অতিরিক্ত শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে গেলে সেটির প্রভাব অবশ্যই বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর পড়বে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মার্কিন ক্রেতারা অনেক আগ থেকেই অতিরিক্ত শুল্কের সম্ভাবনা ধরে দর-কষাকষি করছিলেন। ফলে নতুন ঘোষণায় বাজারে বড় ধরনের বিস্ময় তৈরি হয়নি। তবে ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশের ওপর প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি শুল্ক আরোপ করা হয়, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য একটি সম্ভাব্য ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ) ব্যবস্থাও বিবেচনা করছে। এটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা বা বস্ত্র কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। যদিও বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শ্রমমান উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা। পাশাপাশি বাজার বহুমুখীকরণ, নতুন বাণিজ্যচুক্তি এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে রপ্তানি ঝুঁকি কমানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান সুরক্ষাবাদী নীতির মধ্যে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় শুল্কের ব্যবধান সীমিত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের বাজার হারানোর আশঙ্কা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে নীতিগত সংস্কার, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমমান উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক বাণিজ্য উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে।