প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়নি, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিসর—পশ্চিমা বিশ্বে। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় অংশে যে নীতি অনুসরণ করা হয়েছে, সেখানে ফিলিস্তিন সংকটকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা ছিল অন্যতম কৌশল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং এরপর গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সেই রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল, আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা তৈরি হবে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া আব্রাহাম অ্যাকর্ড সেই নীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করেছিল। সেই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন অনেকটাই আড়ালে চলে যাচ্ছিল।
কিন্তু গাজা যুদ্ধ সেই ধারণাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধ দ্রুত আঞ্চলিক উত্তেজনায় রূপ নেয়। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে যে আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে পশ্চিমা সমাজের ভেতরে। আগে ফিলিস্তিন প্রশ্ন মূলত মানবাধিকারকর্মী, বামপন্থী রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আন্দোলনের বিষয় হিসেবে দেখা হতো। এখন এটি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতি, দলীয় অবস্থান এবং সরকারি নীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ইউরোপে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রবণতা তার একটি বড় উদাহরণ। স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে স্লোভেনিয়াও একই পথে হাঁটে। এসব সিদ্ধান্ত ইউরোপের প্রচলিত কূটনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে এখন ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যেও গাজা যুদ্ধের প্রভাব রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লেবার পার্টির অভ্যন্তরে ফিলিস্তিন নীতি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দলের একটি অংশ মনে করে, গাজা পরিস্থিতিতে অবস্থান নির্ধারণে ব্যর্থতার কারণে অনেক ঐতিহ্যগত ভোটার দল থেকে দূরে সরে গেছেন। মুসলিম ভোটার, তরুণ প্রজন্ম এবং মানবাধিকারকেন্দ্রিক রাজনীতির সমর্থকদের মধ্যে ফিলিস্তিন ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিবর্তন আরও গভীরভাবে দৃশ্যমান। কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলকে সমর্থন করা ছিল মার্কিন রাজনীতির অন্যতম স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক—উভয় দলের বড় অংশই ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশের মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছে।
জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে আগের প্রজন্মের তুলনায় ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। তাদের বড় অংশ যুদ্ধ, মানবাধিকার এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। গাজার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি প্রচারিত ছবি ও ভিডিও পশ্চিমা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রচলিত সংবাদ কাঠামোর বাইরে সাধারণ মানুষ সরাসরি যুদ্ধের বাস্তবতা দেখতে পেয়েছে, যা জনমত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
তবে জনমতের পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি সরকারি নীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলের প্রতি দীর্ঘদিনের সামরিক, কৌশলগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এখনো শক্তিশালী। মার্কিন কংগ্রেস, প্রতিরক্ষা কাঠামো এবং কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই সম্পর্কের গভীর প্রভাব রয়েছে।
তবুও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাচ্ছে। ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি পররাষ্ট্রনীতি বিষয় নয়; এটি পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই, ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নির্ধারণে এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের যে গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছিল, গাজা পরিস্থিতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে অনেক দেশ দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ তুলেছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ মনে করছে, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে শক্তিশালী দেশগুলোর ভূমিকা সব ক্ষেত্রে একরকম নয়।
আন্তর্জাতিক আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিভিন্ন পদক্ষেপও এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের মিত্র দেশগুলোও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান সমর্থন করেছে, তবু বিশ্ব রাজনীতিতে এই প্রশ্নগুলো নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই—এটি আর শুধু ভূখণ্ড বা সীমান্তের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
গাজা যুদ্ধের আগে যে রাজনৈতিক ধারণা ছিল—ফিলিস্তিন প্রশ্নকে পাশ কাটিয়েও মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা তৈরি করা সম্ভব—তা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। পশ্চিমা দেশগুলোর রাজপথ থেকে শুরু করে সংসদ, নির্বাচনী মাঠ এবং কূটনৈতিক টেবিল—সব জায়গাতেই ফিলিস্তিন প্রশ্ন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ফিলিস্তিন ইস্যু এখন আর আগের মতো আড়ালে থাকা কোনো সংকট নয়; এটি পশ্চিমা রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।