GEN-Z ভোটার ধরতে ইনস্টাগ্রামে মোদির নতুন কৌশল

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৩ বার

প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ও সাম্প্রতিক জেন-জি বিক্ষোভের প্রভাব এবার দেশের রাজনীতির প্রচার কৌশলেও পরিবর্তন আনছে। তরুণ ভোটারদের সঙ্গে নতুনভাবে যোগাযোগ তৈরি করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি ডিজিটাল প্রচারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দলটি কোটি কোটি মানুষের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের বড় অংশের কাছে এখন সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও বা রিল। সেই বাস্তবতা বুঝেই মোদির প্রচারেও দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন।

আগের মতো কঠোরভাবে পরিকল্পিত, আনুষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ভাষায় তৈরি ভিডিওর পরিবর্তে এখন তুলনামূলক স্বাভাবিক, হালকা এবং কম সম্পাদিত কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব ভিডিওতে মোদিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীকে বাইক জ্যাকেট ও সানগ্লাস পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। কোথাও পেছনে ব্যবহার করা হয়েছে জনপ্রিয় সংগীত, আবার কোনো ভিডিওতে যুক্ত করা হয়েছে বিনোদনমূলক উপাদান। এমনকি জনপ্রিয় মার্কিন সিটকম ‘ফ্রেন্ডস’-এর থিম সং ব্যবহার করে মোদিকে তরুণদের কাছে পরিচিত ও সহজবোধ্য চরিত্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

গত ৩১ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মোদিকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলতে দেখা যায়, ‘হাই, ফ্রেন্ডস।’ রাজনৈতিক নেতার প্রচলিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে এমন উপস্থাপন তরুণ দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর নতুন কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক জেন-জি বিক্ষোভ। চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ সংকট, সরকারি পরীক্ষায় অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেন।

ভারতে সরকারি চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোকে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। ফলে পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের অভিযোগ তরুণদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করে। এই ক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইনস্টাগ্রাম রিল ও ছোট ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিক্ষোভকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও সরকারের সমালোচনা তুলে ধরেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা সরকারের ইতিবাচক ভাবমূর্তির পাশাপাশি তরুণদের অসন্তোষও ব্যাপকভাবে সামনে আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই বিজেপির প্রচলিত ডিজিটাল কৌশলের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। কারণ, তরুণদের বড় অংশ এখন শুধু রাজনৈতিক বার্তা শুনতে চায় না; তারা এমন কনটেন্ট পছন্দ করে যা স্বাভাবিক, বিনোদনমূলক এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

দিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইনস্টাগ্রামের দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে হলে শুধু বড় রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। এই প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, যেখানে স্বতঃস্ফূর্ততা, রসিকতা এবং ব্যক্তিগত মুহূর্ত বেশি জনপ্রিয় হয়।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোয়োজিত পালও মনে করেন, অতিরিক্ত পরিকল্পিত রাজনৈতিক কনটেন্ট তরুণদের কাছে অনেক সময় কৃত্রিম মনে হতে পারে। যদি কোনো ভিডিওতে প্রতিটি শব্দ, দৃশ্য এবং উপস্থাপনা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে দর্শকের সঙ্গে স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মোদির পাশাপাশি এখন তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সরকারি দপ্তরগুলোও একই ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করছে। আগে যেখানে ফেসবুক ও এক্সে তৈরি করা লিখিত পোস্ট বা ছবি বেশি গুরুত্ব পেত, সেখানে এখন ভিডিও রিলের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।

বিজেপির একটি মন্ত্রীর যোগাযোগ দলের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দলের নতুন কৌশল হলো ভিডিওকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা। কম সম্পাদনা, সরাসরি ক্যামেরার ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত মুহূর্ত তুলে ধরার মাধ্যমে তরুণ দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

এমনকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তরুণ ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছাতে স্ন্যাপচ্যাটের মতো নতুন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা করছে।

এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন। ভারতের মোট জনসংখ্যার বড় অংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। আগামী নির্বাচনে জেন-জি ভোটাররা দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রায় ৪০ কোটির বেশি তরুণ ভোটারের মন জয় করতে পারলে বিজেপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি যদি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য রাখেন, তাহলে তরুণ ভোটারদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশল পরিবর্তন করলেই তরুণদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ জেন-জি ভোটারদের একটি বড় অংশ চাকরি, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মতো বাস্তব সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

তরুণদের কাছে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা হিসেবে মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে ‘আমি জেন-জি’ ধরনের প্রচারও শুরু হয়েছে। এসব প্রচারে তরুণদের সমর্থন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থার বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে।

তবে সমালোচকদের মতে, ইন্টারনেট সংস্কৃতি অনেক সময় রাজনৈতিক প্রচারকে সহজে গ্রহণ করে না। কোনো রাজনৈতিক দল যদি কৃত্রিমভাবে তরুণদের ভাষা ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি প্রশংসার পাশাপাশি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপেরও শিকার হতে পারে।

লেখক ও পডকাস্টার অনুরাগ মিনাস ভার্মার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তরুণদের প্রকৃত উদ্বেগ সমাধান করাই সবচেয়ে বড় বিষয়। শুধু রিল তৈরি করে তরুণ ভোটারদের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন পাওয়া কঠিন।

জেন-জি বিক্ষোভ ভারতের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রচারণার ওপর নির্ভর করছে না; তারা কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের সুযোগ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছে।

মোদি ও বিজেপি সেই বাস্তবতা বুঝেই এখন তরুণদের পছন্দের প্ল্যাটফর্মে নতুন ভাষায় নিজেদের উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। বাইক জ্যাকেট, সানগ্লাস, র‌্যাপ সংগীত কিংবা ‘হাই, ফ্রেন্ডস’—এসব শুধু ভিডিওর পরিবর্তন নয়, বরং ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরির রাজনৈতিক পরীক্ষা।

তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে তরুণরা শুধু ভিডিওর উপস্থাপন গ্রহণ করবে, নাকি তাদের বাস্তব সমস্যার সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেবে—তার ওপর।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত