রোগ প্রতিরোধে জোর, দেশজুড়ে কলেরা টিকাদান শুরু

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৭ বার
রোগ প্রতিরোধে জোর, দেশজুড়ে কলেরা টিকাদান শুরু

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেয়ে রোগের আগেই তা প্রতিরোধের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার—এমন মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তাঁর মতে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে একদিকে মানুষকে রোগের কষ্ট থেকে রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপও কমানো যায়। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশব্যাপী ওরাল কলেরা টিকাদান কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।

বুধবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তিনি নিজ হাতে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে কলেরা টিকা দিয়ে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রমকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা বেশি কার্যকর। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হলে মানুষ সুস্থ থাকবে এবং একই সঙ্গে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর রোগীর বাড়তি চাপও কমবে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এই পরিবর্তনকে তিনি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন।

কলেরা একটি পানিবাহিত সংক্রামক রোগ, যা মূলত দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এ রোগ দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। ফলে রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণ ঠেকানোর ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার সঙ্গে কলেরা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা, বন্যা বা জলাবদ্ধতার সময় পানির উৎস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। তাই টিকাদানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের ইতিহাসে এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ এগিয়ে চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সরকার একদিকে চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

দেশব্যাপী ওরাল কলেরা টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া। শহরের পাশাপাশি দূরবর্তী গ্রাম, দুর্গম চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছেও টিকা পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে যে ধরনের বাস্তব সমস্যা রয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী টিকাদান কর্মসূচিকে কেবল সরকারি উদ্যোগ হিসেবে না দেখে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া একটি বড় জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা কঠিন। তাই মানুষের মধ্যে টিকা নিয়ে আস্থা তৈরি করা, প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো এবং টিকাদান কেন্দ্রে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে শুধু টিকা গ্রহণ করলেই কলেরা ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে নিরাপদ পানি, হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পান করা ও রান্নার কাজে নিরাপদ পানি ব্যবহারের পাশাপাশি ঘরের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত পানিও যেন দূষিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নিরাপদ পানির উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করার পর তা যদি অপরিচ্ছন্ন পাত্রে রাখা হয় বা ব্যবহারের সময় জীবাণু দ্বারা দূষিত হয়, তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। তাই পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন।

নিয়মিত ও সঠিকভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাসও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাবার প্রস্তুত ও গ্রহণের আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করার অভ্যাস ব্যক্তি ও পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এ ধরনের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবও কলেরা বিস্তারের অন্যতম ঝুঁকি। খোলা স্থানে মলত্যাগের কারণে মানুষের বর্জ্য পানির উৎস বা খাবারের সঙ্গে মিশে গেলে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে। তাই সারা দেশে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ওরাল রিহাইড্রেশন স্যালাইনের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে সরকার ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় জাতীয় ওরাল রিহাইড্রেশন ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল। একইভাবে দেশের টিকাদান কার্যক্রমও কয়েক দশক ধরে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি টিকার সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে বিতরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা সরবরাহে ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কারিগরি ও সরবরাহ সহযোগিতার কথাও সরকারি পর্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

কলেরা প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে প্রস্তুত রাখাও জরুরি। কারণ কোনো এলাকায় সংক্রমণ দেখা দিলে দ্রুত রোগী শনাক্ত করা, পানিশূন্যতা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং আক্রান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশেষ করে তীব্র ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু টিকা নেওয়ার সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া নয়, দৈনন্দিন জীবনে নিরাপদ পানি ব্যবহার, হাত ধোয়া, খাবার পরিষ্কার রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো এলাকায় পানির উৎস দূষিত হলে বা ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়লে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন।

দেশব্যাপী এই টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে কলেরা প্রতিরোধে নতুন করে জনসচেতনতা তৈরির সুযোগও তৈরি হয়েছে। একটি টিকাদান কর্মসূচি তখনই সফল হয়, যখন মানুষ শুধু টিকা গ্রহণ করে না, বরং কেন টিকা প্রয়োজন এবং রোগ প্রতিরোধে আরও কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সে বিষয়েও সচেতন হয়।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই শুধু টিকার ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। রোগ হওয়ার পর হাসপাতালমুখী হওয়ার পরিবর্তে রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি কমানোর যে ধারণা তিনি তুলে ধরেছেন, তা বাস্তবায়নে টিকাদান, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি—সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

দেশজুড়ে ওরাল কলেরা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে নির্ধারিত জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা এবং দুর্গম এলাকাতেও কার্যক্রমের সুফল পৌঁছে দেওয়া। এর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে এমন একটি স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে রোগ প্রতিরোধ ব্যক্তিগত অভ্যাস থেকে শুরু করে সামাজিক দায়িত্বে পরিণত হবে। সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী টিকাদান কর্মসূচি সফল হলে কলেরা ও ডায়রিয়াজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com