হরমুজে মার্কিন নিরাপত্তায় বাড়ছে তেলবাহী জাহাজ চলাচল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
হরমুজে মার্কিন নিরাপত্তায় বাড়ছে তেলবাহী জাহাজ চলাচল

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে নজর কেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রণালিটির দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি নৌপথ ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজকে নিরাপদে পারাপারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে রাতের বেলায় একাধিক ট্যাংকারকে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ওই পথ দিয়ে পার করে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ট্যাংকার দক্ষিণাঞ্চলীয় এই রুট ব্যবহার করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের হিসাবে, এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক যে পরিমাণ তেল রপ্তানি হতো, বর্তমান প্রবাহ তার প্রায় অর্ধেক। কোনো কোনো দিনে পরিবহনের পরিমাণ আরও বেড়ে দেড় কোটি থেকে দুই কোটি ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছেছে বলেও কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।

তবে এসব পরিসংখ্যানকে মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে প্রতিদিন ঠিক কত পরিমাণ তেল পরিবহন হচ্ছে, তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজের অবস্থান, গতিপথ ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য আংশিকভাবে গোপন রাখা হচ্ছে। কিছু জাহাজের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস সংকেতও নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার হিসাবে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যকার এই সরু জলপথ দিয়ে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এই পথের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি বাজারেও দ্রুত প্রভাব পড়ে।

চলমান সংঘাতের সময় হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সংঘাতের কারণে বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং হামলার আশঙ্কায় অনেক জাহাজ মালিক প্রণালিটি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ তেল আটকে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে যুদ্ধবিরতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির পর জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে।

জুনের মাঝামাঝি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন দ্রুত বাড়ার তথ্যও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। সে সময় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে মার্কিন সামরিক সহায়তা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ার ফলে জাহাজ মালিকদের আস্থা ফেরার কথা জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জুলাইয়ের শুরুতে বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ দৈনিক এক কোটি ব্যারেলের ওপরে উঠেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সংঘাত ও হামলার আশঙ্কায় আবারও জাহাজ চলাচলে ওঠানামা দেখা যায়।

নতুন ব্যবস্থায় শুধু তেলভর্তি জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে না। খালি ট্যাংকারগুলোকেও আরব সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরে পৌঁছাতে সহায়তা করা হচ্ছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি। অর্থাৎ, একটি ট্যাংকার যখন উপসাগর থেকে তেল নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন অন্য একটি খালি ট্যাংকারকে পরবর্তী চালানের জন্য একই পথে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই তৎপরতায় সমুদ্রপথের নিরাপত্তার পাশাপাশি আকাশপথের নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য হামলা থেকে জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে কাজ করছে। চলতি সপ্তাহে আটটি ইরানি ড্রোন ও দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবিও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের দাবির স্বাধীন যাচাই সব সময় সম্ভব হয় না।

মার্কিন কর্মকর্তারা আরও দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে ইরানের রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারি অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের নজরদারি আগের তুলনায় সীমিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান এখন অনেক ক্ষেত্রে জাহাজের সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করার পরিবর্তে অনুমানের ভিত্তিতে হামলার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, এই পরিস্থিতিই সীমিত পরিসরে একটি নিরাপদ সামুদ্রিক করিডর পরিচালনার সুযোগ তৈরি করেছে।

এই ব্যবস্থাকে ঘিরে অবশ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালি এখনো সামরিক উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি কমলেও জাহাজ মালিকদের জন্য বীমা, রুট নির্বাচন ও যাত্রার সময় নির্ধারণ এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে।

অন্যদিকে ইরানও হরমুজের সামুদ্রিক চলাচলের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে। আগস্টের শুরুতে ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন নিরাপদ নৌপথের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা জানায়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জাহাজের নিরাপদ চলাচল, আইনি কাঠামো, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, হরমুজের ভবিষ্যৎ নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যেও আলাদা উদ্যোগ চলছে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহারের উদ্যোগকে শুধু সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না অনেক পর্যবেক্ষক। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাজারের স্থিতিশীলতা এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ—সবকিছুই জড়িয়ে আছে। হরমুজ দিয়ে তেল যত বেশি পরিমাণে বের হতে পারবে, ততই আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ঘাটতির আশঙ্কা কমবে। একই সঙ্গে ইরানের হাতে হরমুজকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বের হওয়ার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না। তার দাবি, সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের সক্ষমতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে সামরিক চাপের পাশাপাশি জ্বালানি পরিবহন সচল রাখাও মার্কিন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই নিরাপত্তাব্যবস্থা কতদিন কার্যকর রাখা সম্ভব হবে। হরমুজের মতো সংকীর্ণ ও কৌশলগত জলপথে কয়েকটি হামলা বা বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনাই আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবস্থায় নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামুদ্রিক চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। ফলে হরমুজের পরিস্থিতি এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তেল আমদানিকারকদের জন্য তাই হরমুজের প্রতিটি জাহাজ চলাচল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল নিরাপদে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারলে সরবরাহের চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিপরীতে আবারও যদি জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত গোপন রুট এখন শুধু একটি সামরিক অভিযানের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত