হরমুজে গোপন করিডোরে তেল পরিবহন করছে যুক্তরাষ্ট্র

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান যুদ্ধের অচলাবস্থার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনে একটি গোপন নৌপথ বা শিপিং করিডোর চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ এই অভিযানের মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল নিরাপদে প্রণালি পার হয়ে বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এর আওতায় প্রতি রাতে ওমানের উপকূল ঘেঁষা হরমুজ প্রণালির একটি দক্ষিণ চ্যানেল দিয়ে ১৫ থেকে ২০টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই করিডোরের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করছে। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই সরবরাহ প্রায় অর্ধেক হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।

যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। নতুন এই করিডোর চালু হওয়ার ফলে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং বাজারেও চাপ কমছে।

যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে গোপন করিডোর

মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই অভিযান শুধু তেলবাহী জাহাজকে পাহারা দিয়ে বের করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথমে খালি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে আরব সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে সহায়তা করা হয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে তেল সংগ্রহের পর জাহাজগুলো আবার একই নিরাপদ পথ ধরে আরব সাগরের দিকে ফিরে আসে।

অভিযানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানান, প্রায় দুই মাস ধরে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ লেনটি মার্কিন বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারলেও প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই বলে দাবি করেন তিনি।

নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগের সেনা সদর দপ্তর থেকে পরিচালিত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স এই অভিযান সমন্বয় করছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গেও তারা সমন্বয় করছে।

প্রতিদিন উপসাগর থেকে আরব সাগরের দিকে যাওয়া জাহাজ এবং তেল সংগ্রহের জন্য আরব সাগর থেকে উপসাগরে প্রবেশ করা খালি ট্যাঙ্কারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে জাহাজগুলোকে দলবদ্ধ করে নিরাপদ পথে পরিচালনা করা হয়।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজগুলো ওমানের উপকূলসংলগ্ন দক্ষিণ চ্যানেল ব্যবহার করছে। ইরানের সম্ভাব্য ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানও নজরদারি করছে।

ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল করার দাবি

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেন্ট্রাল কমান্ডের সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহের সামরিক অভিযানের পর এই করিডোর চালু করা সম্ভব হয়েছে। ওই অভিযানে ইরানের রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার ওপর হামলা চালানো হয় বলে দাবি তাদের।

এর ফলে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ চ্যানেলে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের নজরদারি ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাহিনী এখন নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের পরিবর্তে অনুমানের ওপর নির্ভর করে সম্ভাব্য জাহাজ চলাচলের এলাকায় ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে।

তবে ইরানের কিছু হামলা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে বলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, অধিকাংশ হামলা মার্কিন বাহিনী প্রতিহত করেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে আটটি ইরানি ড্রোন ও দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার কথাও জানানো হয়েছে।

প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ

মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে প্রতি রাতে ১৫ থেকে ২০টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ চ্যানেল ব্যবহার করেছে। এর ফলে তেল রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে এই পথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। কোনো কোনো রাতে সরবরাহের পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্তও পৌঁছেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বের হচ্ছে।

তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আলোচনা চলছে না বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, ইরান সময়ক্ষেপণ করছে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করাকে তিনি সময়ের অপচয় হিসেবে দেখছেন।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের মধ্যে এখনো কিছুটা প্রতিরোধের সক্ষমতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে দেশটি আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই জলপথে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে। ফলে যুদ্ধের মধ্যেও এই পথে তেল পরিবহন সচল রাখার মার্কিন উদ্যোগ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত