গ্যাস সংকট কাটেনি, শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সামিটের টার্মিনালে নতুন কার্গো এলেও জাতীয় গ্রিডে বাড়তি গ্যাস যোগ হয়নি। অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালেও মজুত না থাকায় সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সাভার-আশুলিয়া ও ভালুকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কমেছে, কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুট। গতকাল বিকেল ৪টায় এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৫৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস, যার পুরোটাই এসেছে সামিটের টার্মিনাল থেকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সামিটের টার্মিনাল বর্তমানে সর্বোচ্চ সক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করছে। ফলে নতুন কার্গো আসার পরও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ হয়নি। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল চালু করতে নতুন এলএনজি কার্গোর প্রয়োজন। আগামী রোববার একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। সেটি এলে ওই টার্মিনাল থেকে আবার সরবরাহ শুরু হতে পারে।

সীমিত গ্যাসের মধ্যেও গতকাল বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট, সার কারখানায় ২১ কোটি এবং সিএনজিতে প্রায় ২ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়েছে। শিল্প ও আবাসিক খাত মিলিয়ে পেয়েছে প্রায় ১০২ কোটি ঘনফুট। গত বছরের একই সময়ে এ দুই খাতে সরবরাহ ছিল প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুট।

তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, স্বাভাবিক সময়ে তিতাসের সরবরাহ লাইনে দৈনিক প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও এলএনজি সংকটের পর তা ১০০ থেকে ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পাঞ্চলে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে সাময়িকভাবে সংকট কিছুটা কমতে পারে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে হবে।

এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা

গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এলএনজি সরবরাহের ঘাটতি। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় ২৫ দিন সেটি বন্ধ ছিল। মেরামতের পর সরবরাহ শুরু হলেও প্রয়োজনীয় কার্গো না আসায় মজুত দ্রুত কমে যায়। ১৭ আগস্ট একটি কার্গো আসার কথা থাকলেও সেটি আসেনি। শেষ পর্যন্ত বুধবার বিকেল থেকে টার্মিনালটি আবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

চলতি মাসে দেশে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকি কার্গোগুলোর তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে, একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এবং একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হচ্ছে।

সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির কার্গোগুলোর কয়েকটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একটি নির্ধারিত সময়ে আসতে পারেনি। আরেকটি কার্গোর জাহাজের ওপর যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেটিও সময়মতো আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হককে ডেকে সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চান। পরে এলএনজি কেনার অর্থায়নসহ সংকট মোকাবিলার বিষয়ে অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করে জ্বালানি বিভাগ।

গাজীপুরে বন্ধ ২০ থেকে ২২ শতাংশ কারখানা

গাজীপুরে গ্যাসের চাপ না বাড়ায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেলা ও মহানগরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসনির্ভর কারখানা প্রায় সাড়ে ৪০০টি।

টেক্সটাইল, ডাইং, ফিনিশিং, ডেনিম, নিটিং ও ওভেন কারখানা চালাতে সাধারণত ৭ থেকে ৮ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক কারখানায় চাপ নেমে গেছে এক পিএসআইয়ের নিচে, কোথাও তা শূন্যের কাছাকাছি।

শিল্প পুলিশ-২-এর সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, গ্যাস সংকটের কারণে গাজীপুর জেলা ও মহানগরের ২০ থেকে ২২ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বড় কারখানাগুলো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করলেও উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

কোনাবাড়ীর পিএন কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাপস কুমার তালুকদার বলেন, কারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি থাকায় ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

সফিপুরের গোমতী টেক্সটাইলেও উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৩০ শতাংশে। গ্যাসের চাপ না থাকায় শ্রমিকেরা কারখানায় উপস্থিত হয়েও অনেক সময় কাজ শুরু করতে পারছেন না।

সাভার-আশুলিয়ায়ও উৎপাদন কমেছে

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও একই পরিস্থিতি। গ্যাসের অভাবে ডাইং ও ওয়াশিং ইউনিট চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান এলপিজি ও ডিজেল ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় এক মাস ধরে চলা এই সংকটে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং কারখানার আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ভালুকায় ২০ কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি

ময়মনসিংহের ভালুকা ও আশপাশের এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটে প্রায় ২০টি কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। সকালে কাজে যোগ দেওয়ার পর গ্যাসের চাপ না থাকায় ধাপে ধাপে তাঁদের বাড়ি পাঠানো হয়।

শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, ওই অঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গৌরীপুরের টয়ো স্পিনিং মিলসের ৫০টি যন্ত্রের মধ্যে ৪৩টি এবং ভালুকার সীমা স্পিনিং মিলের ৩০টি যন্ত্রের বেশির ভাগই বন্ধ রয়েছে।

চট্টগ্রামে উৎপাদন কমেছে ২৫ শতাংশ

চট্টগ্রামের বড় শিল্পকারখানাগুলোতেও গ্যাসের স্বল্প চাপের প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ২৫ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিএসআরএম, কেএসআরএম ও জিপিএইচ ইস্পাতসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দুই শিফটের পরিবর্তে এক শিফটে উৎপাদন চালাচ্ছে। টিকে গ্রুপ ও সিকম গ্রুপের কয়েকটি কারখানাও বন্ধ রয়েছে।

জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। উৎপাদন প্রায় ২৫ শতাংশ কমলেও কোনোভাবে কারখানা চালু রাখা হচ্ছে। প্রতি টন রড উৎপাদনে খরচও বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি।

কাচ ও সার উৎপাদনেও সংকট

গ্যাসনির্ভর কাচশিল্পে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। কাচ তৈরির চুল্লি দীর্ঘ সময় চালু রাখতে হয়। একবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি পুনরায় চালু করা কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন চুল্লি স্থাপনের প্রয়োজন হয়।

নাসির ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম বিশ্বাস বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় ফার্নেস চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করা গেলেও উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।

সার উৎপাদনেও সংকট দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন ৪ মার্চ থেকে বন্ধ। আগামী ২ সেপ্টেম্বর থেকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার কথা রয়েছে। কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় কম। আর গ্যাস ও ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে ২৮ জুন থেকে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনেও ভোগান্তি

শিল্পের পাশাপাশি রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় আবাসিক গ্রাহকেরাও গ্যাসের স্বল্প চাপের সমস্যায় পড়েছেন। অনেক এলাকায় স্বাভাবিক রান্না করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। কেউ ভোরে, কেউ রাতে রান্নার সুযোগের অপেক্ষায় থাকছেন। কোথাও বিকল্প জ্বালানিও ব্যবহার করতে হচ্ছে।

গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। তেজগাঁওয়ের একটি সিএনজি স্টেশনের কর্মীরা জানান, কম চাপের কারণে গাড়িতে গ্যাস দিতে বেশি সময় লাগছে। এতে স্টেশনের ভেতরে ও সড়কে গাড়ির সারি তৈরি হচ্ছে।

গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় যাত্রীবাহী যানবাহনের চালকদেরও আয় কমছে। কেউ কেউ সিএনজির পরিবর্তে এলপিজি ব্যবহার করছেন, এতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কয়েকটি রুটে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়াও ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশের গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, সার, আবাসিক গ্রাহক ও পরিবহন—সব খাতেই এর প্রভাব পড়ছে। সাময়িকভাবে নতুন এলএনজি কার্গো সংকট কিছুটা লাঘব করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং নির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত