সাইবার হামলা ঠেকাতে প্রতিরোধ সক্ষমতাই মূল শক্তি

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাইবার হামলা এখন আর নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। র‍্যানসমওয়্যার, তথ্য চুরি, ফিশিং, ম্যালওয়্যার, ক্রেডেনশিয়াল চুরি এবং সফটওয়্যারের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো হামলার পূর্বাভাস পাওয়ার আগেই ক্ষতির মুখে পড়ছে। ফলে শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন নয়, হামলা শনাক্ত, নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সক্ষমতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক এসকিউ ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে গড়ে দুই হাজার সাইবার হামলার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব হামলার সংখ্যা প্রতিবছর প্রায় ১৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। অন্যদিকে সেন্টিনেলওয়ানের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

এই বৈশ্বিক ঝুঁকি থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের গবেষণা বলছে, দেশের ৫২ শতাংশ ব্যাংক সাইবার ঝুঁকির মধ্যেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে আর্থিক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা বড় ধরনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কেও বিভিন্ন ধরনের সাইবার হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধের জন্য জোরালো মনিটরিং, ইনসিডেন্ট ম্যানেজমেন্ট, অ্যাকসেস কন্ট্রোল, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাইবার হামলার অন্যতম প্রচলিত কৌশল হলো ফিশিং। দেখতে স্বাভাবিক বা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়—এমন ই-মেইল, বার্তা কিংবা লিংকের মাধ্যমে কর্মীদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় ব্যবহারকারী বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই ক্ষতিকর লিংকে ক্লিক করে ফেলেন। এ ছাড়া অথেন্টিকেশন ও সেশন ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতাও অনুপ্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এ কারণে শুধু প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করলেই যথেষ্ট নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যান্ডপয়েন্ট, সার্ভার, নেটওয়ার্ক ও ক্লাউড এনভায়রনমেন্ট নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা প্রয়োজন। সন্দেহজনক আচরণ দ্রুত শনাক্ত করতে হলে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া নিরাপত্তা তথ্য এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণের সক্ষমতাও থাকতে হবে।

এখানে সিকিউরিটি ইনফরমেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বা সিআইইএম এবং এক্সটেন্ডেড ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স বা এক্সডিআর প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। এসব প্রযুক্তি বিভিন্ন সিস্টেম থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত করতে নিরাপত্তা দলকে সহায়তা করে। ফলে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে দ্রুত সতর্ক হওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

বাংলাদেশে এ ধরনের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে কাজ করছে দ্য টিম ফিনিক্স গ্রুপ (টিটিপিজি) ও ওয়াজুহ। ওয়াজুহ একটি ওপেন-সোর্স সাইবার নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সিআইইএম ও এক্সডিআরের সমন্বয়ে অ্যান্ডপয়েন্ট, ক্লাউড ওয়ার্কলোড এবং নেটওয়ার্কের বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে লগ বিশ্লেষণ, দুর্বলতা শনাক্তকরণ, কনফিগারেশন মূল্যায়ন, থ্রেট হান্টিং এবং ইনসিডেন্ট রেসপন্সে সহায়তা পাওয়া যায়। কোনো সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে ক্ষতি সীমিত রাখার লক্ষ্য থাকে।

টিটিপিজি ২০১৮ সাল থেকে ওয়াজুহের সঙ্গে কাজ করছে এবং ২০২৬ সাল থেকে অংশীজন হিসেবে যুক্ত হয়েছে। যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা নজরদারিকে আরও সমন্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। টিটিপিজির সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার বা এসওসি এবং ম্যানেজড সিকিউরিটি সার্ভিসে ওয়াজুহ যুক্ত করার ফলে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং, থ্রেট ইন্টেলিজেন্স, ইনসিডেন্ট রেসপন্স ও ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রম সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও অথেন্টিকেশন ব্যবস্থা, প্রয়োজনভিত্তিক অ্যাকসেস কন্ট্রোল, নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত রিপোর্ট করার অভ্যাস সাইবার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার নিরাপত্তাকে এককালীন বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি যত বড় হবে, সাইবার ঝুঁকিও তত বাড়বে। তাই সার্বক্ষণিক নজরদারি, দক্ষ জনবল, কার্যকর রেসপন্স পরিকল্পনা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা প্রয়োজন।

কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানই শতভাগ সাইবার হামলামুক্ত থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত—হামলা দ্রুত শনাক্ত করা, ক্ষতি সীমিত রাখা, আক্রান্ত সিস্টেম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসা। অর্থাৎ সাইবার নিরাপত্তায় শুধু সুরক্ষা নয়, প্রতিরোধ ও পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাই হয়ে উঠছে টেকসই ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত