জেজুতে তিন দিনে চার মরদেহ, ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র জেজু দ্বীপে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে নিখোঁজ চার ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিখোঁজ হওয়া এসব ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাগুলো এরই মধ্যে দ্বীপটির নিরাপত্তা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার শুরু শনিবার। জেজুর একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম থেকে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ৫১ দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। পরদিন দ্বীপটির উত্তর উপকূলের সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হয় সত্তরের কোঠায় বয়সী আরেক ব্যক্তির মরদেহ। তিনিও কিছুদিন আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন।

এর দুই দিন পর দ্বীপের ভিন্ন দুটি এলাকা থেকে আরও দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের একজন ৩৭ বছর বয়সী জং মি-রান। মে মাসে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিখোঁজ হওয়া চার ব্যক্তির মরদেহ মাত্র তিন দিনের মধ্যে উদ্ধারের ঘটনা জেজুর মতো তুলনামূলক ছোট একটি দ্বীপে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব মৃত্যুর কোনো ঘটনাকেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত বলে নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ।

সাদা বালুর সৈকত ও স্বচ্ছ নীল পানির জন্য বিখ্যাত জেজু দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। দ্বীপটিতে রয়েছে বহু বিলাসবহুল রিসোর্ট ও পর্যটন অবকাঠামো। গত বছর সেখানে দেশি-বিদেশি এক কোটিরও বেশি পর্যটক গিয়েছিলেন।

তবে সাম্প্রতিক নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনাগুলো দ্বীপটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

ঘটনাগুলোর আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ‘বু’ পদবির এক পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর বিরুদ্ধে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার আগেই কয়েকটি মামলার নথি বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।

ষাটোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি এবং জং মি-রানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা—দুটি মামলাই দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন বু। অভিযোগ রয়েছে, উভয় ক্ষেত্রেই তিনি নিখোঁজ ব্যক্তিরা নিরাপদে আছেন বলে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।

ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তির ক্ষেত্রে বু দাবি করেছিলেন, তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং পরিবার জানিয়েছে ওই ব্যক্তি নিরাপদে আছেন। তবে তিনি পরিবারের কাছে নিজের অবস্থান জানাতে চান না। পরিবারের সদস্যরা সেই তথ্য বিশ্বাস করে অপেক্ষা করেন।

নিহত ব্যক্তির ছেলে সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ যখন জানিয়েছিল তাঁর বাবা নিরাপদে আছেন, তখন তাঁরা সেটি বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু ৫১ দিন পর তাঁরা বাবার মরদেহ পান।

জং মি-রানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বু তাঁর প্রেমিককে জানিয়েছিলেন, ফোনে জংয়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং জং নিজেই যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে ওই ফোনকলের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

মে মাসে জং নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর প্রেমিক ১৭ জুলাই আবার পুলিশের কাছে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, তখনও বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। পরে ১৯ জুলাই তিনি সিউলের একটি থানায় নতুন করে অভিযোগ দায়ের করেন।

এরপর জংকে সর্বশেষ যেখানে দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরের একটি খেজুরবাগান থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনার পর তদন্তের আওতা বাড়ানো হয়। বুয়ের দায়িত্বে থাকা ২৯৮টি মামলাই পুনর্বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে অন্তত ১০টি মামলা নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্ধ করার অভিযোগ বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সংস্কারের নির্দেশ

ঘটনাটি নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পুলিশের তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন।

ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির অধীন জাতীয় তদন্ত ব্যুরোর প্রধান হং সক-কি এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পুরো তদন্তব্যবস্থায় সংস্কারের কথা জানিয়েছেন তিনি।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত নিখোঁজ-সংক্রান্ত ব্যবস্থায় কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার লিখিত অনুমোদন ছাড়াই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিখোঁজ মামলার নথি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে পারেন। জেজুর ঘটনা সামনে আসার পর এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দেশটিতে প্রতি বছর ৭০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিখোঁজ হন। তাদের প্রায় ৯৯ শতাংশের ঘটনা এক মাসের মধ্যে সমাধান হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়।

তবে জেজুর চার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। কোনো ঘটনার ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। একই সঙ্গে চারটি ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধের অংশ হিসেবে দেখার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার দাবি

পুলিশ কর্মকর্তা বু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এক পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তিনি দাবি করেছেন যে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি সত্যিই যোগাযোগ করেছিলেন।

তবে কেন তিনি পরিবারের কাছে এমন তথ্য দিয়েছিলেন এবং কেন কয়েকটি মামলা দ্রুত বন্ধ করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাগুলো নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ জেজুতে কোনো সক্রিয় সিরিয়াল কিলার থাকার আশঙ্কা করছেন। আবার কেউ মানবপাচারকারী চক্রের সম্পৃক্ততার কথাও বলছেন। তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জেজুতে পর্যটকদের উদ্বেগ

নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জেজু ভ্রমণ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণ বাতিল করার কথাও জানিয়েছেন।

সিউলে অবস্থানরত বিবিসির সাংবাদিক জেক কোওন ঘটনাটির অতিরঞ্জিত সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ঘটনাটিকে রহস্যময় অপরাধ হিসেবে দেখার আগে পুলিশের তদন্তব্যবস্থার ব্যর্থতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে দ্বীপে থাকা কিছু মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে এক পর্যটক জানান, জেজুর একটি রেস্তোরাঁর মালিক তাঁকে রাতে হেঁটে হোটেলে ফিরতে নিষেধ করেছিলেন। রেস্তোরাঁর মালিক নাকি সাম্প্রতিক নিখোঁজ ও হত্যার কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেছিলেন।

গত নয় বছর ধরে জেজুতে বসবাস করা দক্ষিণ কোরীয় অভিনেত্রী জিন জে-ইয়ংও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, রাতে সাধারণত বাইরে বের না হলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে জেজুতে হাঁটাচলা করতেও তাঁর কিছুটা ভয় লাগছে।

তবে চার ব্যক্তির মৃত্যুর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পাশাপাশি পুলিশের গাফিলতি, নিখোঁজের তদন্তে অনিয়ম এবং মামলার নথি বন্ধের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেজুতে কোনো সংঘবদ্ধ হত্যাকারী বা মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয়—এমন দাবি নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।

Checkout our latest news>>

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত