প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৪৭২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৪৬৯ জন এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগের ৪৮ ঘণ্টা পরও শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও নদীর তলদেশে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকারীরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় আকস্মিকভাবে প্রবল স্রোতে পানি, বরফ, পাথর ও কাদার ঢল নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার স্রোত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, পথে থাকা যানবাহন ও স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং কয়েকটি এলাকায় জনবসতির চিহ্ন পর্যন্ত মুছে যায়।
নেপাল পুলিশ শুক্রবার জানিয়েছে, দেশটিতে এ পর্যন্ত ৪৬৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় তিনজন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ফলে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রাণহানি অন্তত ৪৭২ জনে পৌঁছেছে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্যোগের পর থেকেই নেপালের রাশুয়া, নুয়াকোটসহ ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষিত কুকুরও ব্যবহার করা হচ্ছে। নদীর স্রোতে মরদেহ অনেক দূরে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায় অনুসন্ধান কার্যক্রম downstream এলাকাতেও সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের মধ্যে। অনেক পরিবার এখনো জানে না তাদের প্রিয়জন জীবিত আছেন কি না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেকের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই দুর্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সীমান্তের কাছাকাছি তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবরগামী যাত্রীদের একটি অংশও এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে যাতায়াত করছিলেন। ফলে নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর হিসাবে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যাও কয়েক শ।
চীনের তিব্বত অঞ্চলেও পরিস্থিতি গুরুতর। সীমান্তবর্তী গিরং এলাকায় ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। তিনজনের মৃত্যুও নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে চীনা কর্তৃপক্ষও জরুরি উদ্ধারকারী দল, যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে।
দুর্যোগটির কারণ নিয়েও বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে বড় ধরনের ভূমিধসের সঙ্গে হিমবাহের একটি অংশ ধসে পড়ে। বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফ লহেন্দে নদীর প্রবাহে পড়ে সাময়িকভাবে পানি আটকে দেয়। এরপর সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণেও ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের এমন ধারাবাহিকতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ভূমিধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক পানির স্রোত পরবর্তী সময়ে পাহাড়ি নদীগুলোর প্রবাহকে ভয়াবহভাবে পরিবর্তন করে। ভুটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপ জমে যায়। অনেক স্থানে নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের জন্য নিখোঁজ মানুষ ও মরদেহ শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা। পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসস্তূপ ও ভূমিধসের কারণে কয়েকটি স্থানে পানি আটকে অস্থায়ী হ্রদ বা জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব জলাধারে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকলে কোনো অংশ ভেঙে গিয়ে আবারও আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এ কারণে জীবিতদের সন্ধানে থাকা উদ্ধারকারীদেরও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
নেপাল সরকারের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা, দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা সচল করার পাশাপাশি নতুন বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই দুর্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে। অনেক পাহাড়ি জনপদ বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হিমবাহ, বরফ ও পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতার ওপর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। তবে বর্তমান দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি এখনই করা হচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা বরং ঘটনাটির ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ুগত কারণ আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছেন।
এদিকে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র। কোথাও কাদার নিচে চাপা পড়েছে ঘরবাড়ি, কোথাও নদীর স্রোতে নিশ্চিহ্ন হয়েছে সড়ক ও সেতু। আবার কোথাও স্বজন হারানো মানুষ উদ্ধারকেন্দ্র ও সেনা ঘাঁটির সামনে অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনের কোনো খবরের আশায়।
মৃতের সংখ্যা ৪৭২ ছাড়িয়ে গেলেও এই দুর্যোগের চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হলে হতাহতের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। আপাতত নেপাল ও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দ্রুত উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা।
হিমালয়ের এই ভয়াবহ দুর্যোগ আবারও দেখিয়ে দিল, পাহাড়ি অঞ্চলে একটি ভূমিধস বা হিমবাহ ধস কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর গতিপথ বদলে দিয়ে বিস্তীর্ণ জনপদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এখন স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত অপেক্ষার, আর উদ্ধারকারীদের কাছে প্রতিটি ধ্বংসস্তূপ নতুন আশার সন্ধান। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই মানবিক বিপর্যয়ের পূর্ণ চিত্রও সামনে আসবে না।