প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতির পেছনে প্রকল্পের ত্রুটিপূর্ণ দলিল, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতাসহ ১৪টি কারণ চিহ্নিত করেছে সরকার। এসব সমস্যা কাটিয়ে এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রস্তুতি ও সম্ভাব্যতা যাচাই জোরদারসহ একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পক্ষে এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণ ও সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সংসদে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পের ত্রুটিপূর্ণ দলিল প্রণয়ন, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্যের অসঙ্গতি বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে। এর সঙ্গে দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের ঘাটতিও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ ও বিভিন্ন ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্বের কারণেও অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে এগোতে পারে না। পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বৃদ্ধি, যথাযথ সমাপ্তি পরিকল্পনা বা এক্সিট প্ল্যানের অভাব এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতাও এডিপি বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সরকারের চিহ্নিত অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে গবেষণালব্ধ ফলাফল যথাযথভাবে কাজে না লাগানো, স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প মনিটরিংয়ের ঘাটতি এবং অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্যে অসামঞ্জস্য। প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা এবং একাধিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে দায়িত্ব বণ্টন ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ঘাটতিও বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা দেশ থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর ডিপিপি বা টিএপিপি প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা এবং ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কাঠামোর ঘাটতিকেও ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার।
এডিপি বাস্তবায়নে গতি ফেরাতে প্রকল্প গ্রহণের আগেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকল্প প্রস্তুতির মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। এর মাধ্যমে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তাকে প্রকল্পের দায়িত্বে ধারাবাহিকভাবে রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে নেতৃত্বের ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের কাজে বিঘ্ন না ঘটে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে নিয়মিত পর্যালোচনা সভা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেসব প্রকল্পের উপযোগিতা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কম অগ্রগতির প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে প্রকল্প পুনর্বিন্যাস, পরিধি পরিবর্তন অথবা প্রকল্পটি চলমান রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্বের কারণও খতিয়ে দেখার উদ্যোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পে অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংশোধনের কারণ পর্যালোচনা করে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংসদকে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতেই পরিকল্পনাগত দুর্বলতা কমানো, প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত নিরসন এবং প্রকল্পের অর্থ ও সময় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা। এর ফলে চলমান এডিপির প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাস্তবায়নযোগ্যতা আরও গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।