প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী (সচিব পদমর্যাদা) রাশেদ খাঁনের একটি বক্তব্য। তিনি মন্তব্য করেছেন, বিগত ১৬ বছর জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের ভেতরেই ‘লুকিয়ে ছিল’ এবং জামায়াতের তুলনায় আওয়ামী লীগের অপরাধকে ‘লঘু’ বলা যায়। শুক্রবার নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের পর দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পারস্পরিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের আচরণ, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে তার মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমাত্রার বিতর্ক তৈরি করেছে।
রাশেদ খাঁন তার পোস্টে জামায়াত নেতা ও সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তার দাবি, তাহের মন্তব্য করেছেন যে বিরোধী দলের সঙ্গে বর্তমান সরকার যে ধরনের আচরণ করছে, আওয়ামী লীগও অতীতে বিরোধীদের সঙ্গে তেমন আচরণ করেনি। রাশেদ খাঁন এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভবিষ্যতে জামায়াত ও এনসিপি আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে নামতে পারে বলে নিজের রাজনৈতিক ধারণা তুলে ধরেন।
তিনি লেখেন, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত লংমার্চের মাধ্যমে দেশকে অশান্ত করার পর ডিসেম্বর থেকে আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে জামায়াত মাঠে নামতে পারে। তবে এটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক অনুমান ও বক্তব্য; এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপির পক্ষ থেকে ওই সময় কোনো সমর্থনমূলক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের বিষয়টি জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। তার পোস্টে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে এক হাজার চারশর বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হওয়ার দাবি তুলে ধরা হয়।
এই প্রসঙ্গেই তিনি জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভূমিকার সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তুলনা করেন। রাশেদ খাঁনের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াতের বিরুদ্ধে অতীতের অভিযোগের তুলনায় আওয়ামী লীগের অপরাধকে ‘লঘু’ বলা যেতে পারে। তবে এই মন্তব্য তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে এসেছে এবং কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত বা নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের ফল হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি।
রাশেদ খাঁন আরও বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হলেও অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতের ওপর যে ধরনের দমন-পীড়ন চালিয়েছে, সেটিকে তিনি ভিন্নভাবে দেখছেন। তার বক্তব্যে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আওয়ামী লীগ যদি জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে জামায়াতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের অতীত আচরণকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর হিসেবে তুলে ধরা হয়।
রাজনৈতিক বক্তব্যের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যেই রাশেদ খাঁনের সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যটি আসে। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ককে সরাসরি বিরোধিতার জায়গা থেকে দেখার সুযোগ নেই। বরং তার ভাষায়, জামায়াত বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের মধ্যেই ‘লুকিয়ে ছিল’। এ কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এখন সামনে আসছে, সেটিকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক বা তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর হিসেবে উপস্থাপনের জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে নতুন রাজনৈতিক বয়ান সামনে আনা হচ্ছে। তিনি এ ধরনের বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডকে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ বা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
তার পোস্টের শেষাংশে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের প্রসঙ্গও আসে। রাশেদ খাঁন মন্তব্য করেন, জামায়াতের বক্তব্যের পাশে দাঁড়িয়ে নাহিদ ইসলাম বিষয়টি উপভোগ করছেন। তবে নাহিদ ইসলামের পক্ষ থেকে রাশেদ খাঁনের এই মন্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের মধ্যে নতুন সমীকরণ এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান, জামায়াতে ইসলামীর উত্থান এবং এনসিপির নতুন রাজনৈতিক পরিচয়—এই তিনটি বিষয়ই দেশের রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে আগামী দিনের নির্বাচনী রাজনীতি ও আন্দোলনের সম্ভাব্য জোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। একদিকে কোনো কোনো পক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির দায়ের কথা বলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক বিভাজন ও সম্পর্কের নতুন ব্যাখ্যা সামনে আসছে। ফলে রাশেদ খাঁনের মন্তব্যও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে রাশেদ খাঁনের যে অনুমান, সেটি এখনো সংশ্লিষ্ট দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান দিয়ে নিশ্চিত হয়নি। ফলে তার বক্তব্যকে রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলগুলোর অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক সহিংসতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে এসেছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলোই রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ, আবার কিছু অভিযোগের বিষয়ে বিচারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও চলমান বা সম্পন্ন হয়েছে।
এই বাস্তবতায় কোনো দলের অপরাধকে অন্য দলের অপরাধের তুলনায় ‘লঘু’ বা ‘গুরুতর’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কারণ এতে একই সঙ্গে ইতিহাস, বিচার, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। রাশেদ খাঁনের সাম্প্রতিক বক্তব্যও তাই শুধু একটি ফেসবুক পোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তার বক্তব্যের মূল সুর হলো, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখার প্রচলিত ব্যাখ্যাকে তিনি প্রশ্ন করছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করছেন, জামায়াতের সাম্প্রতিক বক্তব্য আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা। তবে তার এসব দাবির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
এখন নজর থাকবে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার দিকে। রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের জবাবে তারা কী অবস্থান নেয়, কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জোটের বিষয়ে কোনো নতুন ব্যাখ্যা দেয় কি না, সেটিই পরবর্তী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, রাশেদ খাঁনের মন্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ড, জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক ভূমিকা, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ—সবকিছুকে একসঙ্গে সামনে এনে দেওয়া এই বক্তব্য আগামী দিনেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও পাল্টা বক্তব্যের জন্ম দিতে পারে।