প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নতুন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। জাতীয় গ্রিডে নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী রুফটপ সোলার উৎপাদকরা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা মূল্য পাবেন। ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ বিষয়ে ১ সেপ্টেম্বর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমান বাজারদর এবং বিভিন্ন সময়ে পাওয়া দরপত্রের মূল্য পর্যালোচনা করে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে বিশেষ প্রণোদনার অংশ হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো গ্রাহক বা উৎপাদক নির্ধারিত ৮ টাকার চেয়ে কম ব্যয়ে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারলে সাশ্রয় করা অর্থও তার লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত মূল্যের সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি কম খরচে ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের উদাহরণ অনুযায়ী, কোনো উৎপাদক যদি প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ব্যয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন, তাহলে সরকার নির্ধারিত ১০ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে অবশিষ্ট ১ টাকা ৫০ পয়সা প্রণোদনা হিসেবে পাবেন ওই উৎপাদক। ফলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎপাদকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা তৈরি হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫’-এর আওতায় যেসব গ্রাহক আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন এবং নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা এই সুবিধা পাবেন।
এই গ্রাহকদের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের জন্য পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই হারে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
প্রণোদনা ব্যবস্থায় অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের তথ্য সংরক্ষণ করবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ নিরূপণ এবং বিদ্যুতের মূল্য ও প্রণোদনার হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্বও তাদের ওপর থাকবে।
প্রণোদনার অর্থ সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠানো হবে। নগদ অর্থে কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এতে অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুবিধাভোগীদের তথ্য ও লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর স্থাপন করা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই বিশেষ প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না। ফলে যারা নতুন এই সুবিধা নিতে চান, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার যন্ত্রপাতির মান নিয়েও প্রজ্ঞাপনে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ সংশ্লিষ্ট সব সরঞ্জাম বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে।
সরকারের এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়ানো। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য ভবনের অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট গ্রাহক নিজে ব্যবহার করতে পারবেন এবং অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।
এতে একদিকে গ্রাহকের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে অতিরিক্ত উৎপাদন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ব্যাটারি সংযুক্ত থাকায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করেও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
এই কর্মসূচির বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ থেকে সার্বিক নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কার্যালয় থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা নিতে পারবেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনটি ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী গ্রাহকদের জন্য নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থাটি এখন থেকেই কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে আরও আকর্ষণীয় করতে এই প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ব্যাটারি সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তুলনামূলক বেশি প্রাথমিক ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন এই সুবিধা কতটা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে এবং জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরবরাহ কতটা বাড়াতে পারে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও গ্রাহকদের অংশগ্রহণের ওপর।