প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। চিকিৎসক ও রোগীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পরিবেশকে সুশৃঙ্খল রাখতে এ কার্যক্রমকে নতুনভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সপ্তাহে মাত্র দুদিন চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। দিন দুটি হলো সোমবার ও বৃহস্পতিবার, আর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে দুপুর ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত। এ সময়সীমার বাইরে হাসপাতালের ভেতরে বা প্রাঙ্গণে প্রতিনিধিদের অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে আট দফা নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের কাছে। নির্দেশনায় বলা হয়, চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি রক্ষা, রোগীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রতিনিধি অবশ্যই নিজ প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড দৃশ্যমানভাবে ব্যবহার করবেন। পরিচয়পত্র ছাড়া হাসপাতালের ভেতরে তাদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নির্দেশ অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আরও বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালে যে সব ওষুধ ও পরীক্ষা সরকার অনুমোদিত এবং সরবরাহকৃত, তা ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা সুপারিশ করা যাবে না। বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা নির্দিষ্ট কোম্পানির প্যাড ব্যবহার করে পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রেসক্রিপশনে বা হাসপাতালের কাজে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য কেবল সরকার অনুমোদিত বা সরবরাহকৃত সিল ব্যবহার করা যাবে। তবে বিজ্ঞাপনবিহীন জেনেরিক নামের সিল ব্যবহারে কোনো বাধা নেই।
নির্দেশনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, হাসপাতালের কোনো ডকুমেন্ট, প্রেসক্রিপশন বা রোগীর তথ্যের ছবি তোলা যাবে না। রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা ও তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি, বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির সরবরাহকৃত ওষুধের তালিকা বা বিজ্ঞাপন সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেবিলে রাখা যাবে না।
চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করার এই সীমিত সময়সীমা ওষুধ কোম্পানির দীর্ঘদিনের অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কমাতে কার্যকর হবে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কারণ, অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের সঙ্গে অতিরিক্ত যোগাযোগ তৈরি করে প্রেসক্রিপশনে প্রভাব বিস্তার করেন। এতে অনেক রোগী অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে বাধ্য হন, যা তাদের জন্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে স্বাস্থ্যখাতের নীতি গবেষকরা। তারা বলছেন, চিকিৎসা সেবা যেন বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে এই ধরনের নীতিমালা অত্যন্ত জরুরি। দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ওষুধ কোম্পানির অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে হবে।
তবে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সংগঠনগুলো বলছে, এই নির্দেশনা তাদের কার্যক্রমকে সীমিত করবে এবং ওষুধ বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়ায় নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তাদের মতে, চিকিৎসকদের কাছে নতুন ওষুধ বা উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির তথ্য পৌঁছানো তাদের অন্যতম কাজ। সীমিত সময়ে তা করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
চিকিৎসক সমাজের মধ্যেও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। অনেক চিকিৎসক মনে করেন, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের লাগাতার উপস্থিতি আসলেই বিরক্তিকর এবং চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের পরিবেশ নষ্ট করে। তারা নতুন নির্দেশনা স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে আরেক অংশের চিকিৎসক মনে করেন, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা অনেক সময় নতুন ওষুধ ও গবেষণার ফলাফল জানিয়ে থাকেন, যা চিকিৎসকদের কাজে আসে। এ কারণে সময়সীমা কমিয়ে আনা হলেও সম্পূর্ণ যোগাযোগ ছিন্ন না করাটাই যৌক্তিক হয়েছে।
এদিকে রোগীদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত স্বস্তি তৈরি করেছে। তাদের মতে, চিকিৎসকদের ওপর ওষুধ কোম্পানির চাপ কমলে রোগীরা সাশ্রয়ী দামে ওষুধ কিনতে পারবেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি এই নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তবে আগের মতো প্রতিনিধিরা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। তাই নিয়ম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং অপরিহার্য।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাত দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার মুখে রয়েছে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য। সরকারি হাসপাতালে রোগীরা কম খরচে চিকিৎসা পাবেন বলেই আসেন, কিন্তু অনেক সময় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও নির্দিষ্ট ওষুধ কোম্পানির প্রতি নির্দেশনা রোগীদের খরচ বাড়িয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন নির্দেশনা রোগীদের জন্য স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, নতুন নির্দেশনা চিকিৎসক, রোগী এবং ওষুধ কোম্পানির মধ্যে একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা। সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা যেন রোগীকেন্দ্রিক থাকে, চিকিৎসা যেন বাণিজ্যিক প্রভাবমুক্ত হয়, এবং চিকিৎসকের ভাবমূর্তি যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, সে লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কতটা কঠোরভাবে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারে এবং কত দ্রুত এ নিয়মগুলো স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।