স্বর্ণের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী: বাজারে ভরিতে ১ হাজার ১৫৫ টাকা বৃদ্ধি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
স্বর্ণের দাম আজ বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখিয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) শনিবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভরিতে ১ হাজার ১৫৫ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ভরিতে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৭ টাকা, যা রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে এবং আজ সোমবারও (২২ সেপ্টেম্বর) একই দামে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি, ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ-চাহিদার ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। বাজুস জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের উল্লম্ফন এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

নতুন দাম অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৭ টাকা, ২১ ক্যারেট স্বর্ণের দাম হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৬৯৯ টাকা, আর ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ভরিতে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৮৬ টাকায়। সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৭৯ টাকা। বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এই দামগুলোর সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করতে হবে। তবে গহনার নকশা, মান ও কাজের জটিলতার ওপর ভিত্তি করে মজুরি ভিন্ন হতে পারে।

বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম গত কয়েক বছরে নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। এক দশক আগেও যেখানে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকার মধ্যে, সেখানে এখন দাম প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি মূলত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বৃদ্ধির কারণে ঘটেছে। বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ, তেলের দাম ওঠানামা এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাবও কম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে স্বর্ণের দামে নিয়মিত ওঠানামা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া উৎসবের মৌসুমে যেমন ঈদ, পূজা বা বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়।

অন্যদিকে, স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ ভোক্তারা হতাশা প্রকাশ করছেন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার, যারা বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য স্বর্ণ ক্রয় করে থাকেন, তাদের ওপর এ সিদ্ধান্ত অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, বাজারে স্বর্ণের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ স্বর্ণ ক্রয়ের সামর্থ্য হারাচ্ছে। অন্যদিকে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরবরাহ সংকটের কারণে দাম না বাড়িয়ে তাদের কিছু করার নেই।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারের অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশকেও তার প্রভাব সামলাতে হচ্ছে।

এছাড়া স্থানীয় বাজারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে স্বচ্ছতার অভাব এবং খোলা বাজারে স্বর্ণের আমদানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দাম বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। আমদানি নীতি এবং শুল্ক কাঠামোর কারণে বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানি সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জ। এর ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গেলে দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্বর্ণের বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতদিন অব্যাহত থাকবে। বাজুস জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় করছে। তবে ভোক্তারা বলছেন, এভাবে ক্রমাগত দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে স্বর্ণ।

বাংলাদেশে স্বর্ণের এই অস্থির বাজারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্থনীতিবিদরা কয়েকটি পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রথমত, স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর কাঠামো সহজ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বাজারে স্বচ্ছতা ও নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো না যায়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা হলে স্থানীয় বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার ও বাজুসকে যৌথভাবে একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে স্বর্ণের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে এই প্রবণতা চলমান থাকলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে যেমন বিয়ে কিংবা উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যয়ভার বাড়বে, তেমনি অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। স্বর্ণ শুধুমাত্র একটি অলংকার নয়, বরং এটি বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই এর দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত