সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন আর নেই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৯৫ বার
সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন আর নেই

প্রকাশ: ২৯সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও নরসিংদী-৪ আসনের পাঁচবারের সংসদ সদস্য নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের মৃত্যুতে। সোমবার ভোরে ঢাকার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার ছেলে মঞ্জুরুল মজিদ মাহমুদ সাদী সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কয়েক মাস ধরে তিনি রাজনৈতিক সহিংসতা সংক্রান্ত মামলায় কারাগারে ছিলেন এবং রবিবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকালে তিনি মারা যান।

নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও পরিণত রাজনীতিক, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার জাতীয় রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা ঘটে। এরপর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি আরও চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ক্রমান্বয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করেন। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৯ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করে তিনি ধারাবাহিকভাবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে প্রথমবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। তার মেয়াদকালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে কেন্দ্র করে যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিল, তা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আবারও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান এবং দ্বিতীয় মেয়াদে দেশীয় শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানো ও শিল্প খাতের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

যদিও উন্নয়নকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে তিনি প্রশংসা অর্জন করেছিলেন, জীবনের শেষ ভাগে তার রাজনৈতিক অধ্যায় বিতর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নরসিংদীতে সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ী করা হয় তাকে। এই অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে বন্দি ছিলেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দাবি করে যে আন্দোলন দমন করতে গিয়ে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, অন্যদিকে তার দলীয় সহকর্মীরা বলছিলেন অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই বিতর্কিত অবস্থার মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বন্দি জীবনেই কাটাতে হয়।

তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো শোক প্রকাশ করেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন ছিলেন দলের একনিষ্ঠ নেতা, যিনি সারাজীবন দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীও গভীর শোক জানিয়ে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বিরোধীদলগুলোও শোকবার্তা দিয়েছে, যদিও তারা তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছে। নরসিংদী-৪ আসনের সাধারণ মানুষ তাকে স্মরণ করছেন উন্নয়নকামী একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে। স্থানীয় জনগণের মতে, তার উদ্যোগে এলাকায় বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার মৃত্যু দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেবে। একদিকে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের প্রয়াণে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে একটি বড় ক্ষতির মুখে পড়ল, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও বিতর্ক আগামী দিনের রাজনৈতিক আলাপচারিতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।

তার রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমাত্রিক। একদিকে তিনি উন্নয়ন, শিল্প ও অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রেখেছেন, অন্যদিকে বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্য দিয়েও পথ চলতে হয়েছে তাকে। তার মৃত্যু তাই কেবল একজন নেতার বিদায় নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি যুগের অবসানও বটে।

মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় রেখে গেলেন, যা একদিকে উন্নয়নের দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বিতর্কের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। তার অবদান, দায়িত্বশীলতা এবং বিতর্ক সবই ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে। নরসিংদী-৪ আসনের জনগণ যেমন তাকে তাদের উন্নয়নকামী প্রতিনিধি হিসেবে মনে রাখবে, তেমনি জাতীয় ইতিহাসও তাকে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে মূল্যায়ন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত