প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঘাড়ব্যথা বর্তমান জীবনের একটি খুব সাধারণ সমস্যা। দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কিংবা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে ঘাড়ব্যথা এখন প্রায় সব বয়সী মানুষের নিত্যসঙ্গী। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই সাধারণ ঘাড়ব্যথার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি মারাত্মক স্নায়ুজনিত রোগ, যার নাম সারভাইক্যাল মাইলোপ্যাথি। শুরুতে সাধারণ ব্যথা মনে হলেও ধীরে ধীরে এটি শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সারভাইক্যাল মাইলোপ্যাথি মূলত ঘাড়ের মেরুদণ্ডের ভেতরে থাকা স্পাইনাল কর্ড বা স্নায়ুরজ্জুর ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার ফলে ঘটে। আমাদের মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে যেসব স্নায়ু সংকেত যায় এবং শরীর থেকে যেসব সংকেত মস্তিষ্কে ফিরে আসে, সেই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো এই স্পাইনাল কর্ড। তাই এতে সামান্য সমস্যাও পুরো শরীরের কার্যক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, সারভাইক্যাল মাইলোপ্যাথি সাধারণত ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। শুরুতে রোগী ঘাড়ে হালকা ব্যথা বা শক্ত ভাব অনুভব করেন। অনেক সময় এই ব্যথাকে সাধারণ বলে অবহেলা করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাটি জটিল রূপ নিতে পারে। তখন শুধু ঘাড় নয়, হাত-পা, চলাফেরা এমনকি দৈনন্দিন কাজকর্মেও প্রভাব পড়তে শুরু করে।
এই রোগের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কারও ক্ষেত্রে জন্মগতভাবেই স্পাইনাল ক্যানাল সরু থাকে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাকে তীব্র করে তোলে। আবার ঘাড়ে আঘাত পাওয়া, ডিস্ক প্রলাপস, মেরুদণ্ডের ক্ষয়জনিত পরিবর্তন, অস্টিওফাইট বা হাড়ের বাড়তি বৃদ্ধি—এসব কারণেও স্পাইনাল কর্ডে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হওয়ায় মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
সারভাইক্যাল মাইলোপ্যাথির লক্ষণ অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। রোগীরা প্রথমে হাত বা পায়ের পেশিতে দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন। দৈনন্দিন কাজ যেমন বোতাম লাগানো, কলম ধরা বা ছোট জিনিস ধরতে সমস্যা হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে হাত-পায়ে ঝিনঝিন ভাব বা অবশ ভাব দেখা দেয়। হাঁটার সময় ভারসাম্যহীনতা অনুভব করা, হঠাৎ পা জড়িয়ে যাওয়া বা পড়ে যাওয়ার প্রবণতাও এই রোগের লক্ষণের মধ্যে পড়ে।
ঘাড়ে ব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার অনুভূতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক লক্ষণ দেখা দেয় তখনই, যখন রোগটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তখন মূত্র বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা রোগীর জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। কিছু ক্ষেত্রে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে, যা সরাসরি স্নায়ুর ওপর চাপের ইঙ্গিত দেয়।
চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত রোগের তীব্রতা ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে। হালকা বা প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ও প্রদাহনাশক ওষুধ দেওয়া হয়। পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট ব্যায়াম ও থেরাপি গ্রহণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া যায়। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে ঘাড়ের পেশি শক্তিশালী করা, রক্তসঞ্চালন বাড়ানো এবং মেরুদণ্ডের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়।
তবে যদি স্পাইনাল কর্ডের ওপর চাপ অনেক বেশি থাকে কিংবা স্নায়ুর ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়, তখন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চাপের কারণ দূর করে স্নায়ুকে মুক্ত করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, সারভাইক্যাল মাইলোপ্যাথি একটি প্রগতিশীল রোগ হওয়ায় দেরি না করে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা নিলে স্থায়ী স্নায়ু ক্ষতি ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এই রোগ থেকে বাঁচতে বা ঝুঁকি কমাতে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক জীবনে দীর্ঘ সময় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তাই ডিভাইস ব্যবহারের সময় ঘাড় সোজা রাখা এবং চোখের সমান্তরালে স্ক্রিন রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একটানা দীর্ঘ সময় কাজ না করে নির্দিষ্ট বিরতিতে ঘাড় ও কাঁধের হালকা ব্যায়াম করা প্রয়োজন।
ঘুমানোর সময় খুব উঁচু বালিশ ব্যবহার না করাই ভালো। এতে ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মাথায় অতিরিক্ত ওজন বহন করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যেকোনো ধরনের আঘাত থেকে ঘাড়কে সুরক্ষিত রাখতে হবে। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, হাঁটা এবং শরীরচর্চা মেরুদণ্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাড়ব্যথাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকলে বা সঙ্গে হাত-পায়ে দুর্বলতা, ঝিনঝিন ভাব কিংবা ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই সারভাইক্যাল মাইলোপ্যাথির মতো নীরব ঘাতক রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।