প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার একটি লবণ কারখানায় এসি বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১১ জন শ্রমিক দগ্ধ হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১০ জনকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজনের দগ্ধের মাত্রা গুরুতর হওয়ায় তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের মধ্যেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বোয়ালখালী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম গোমদণ্ডী এলাকায় অবস্থিত কনফিডেন্স সল্ট ফ্যাক্টরিতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম চলাকালে হঠাৎ একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ইউনিট বিস্ফোরিত হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে কারখানার একটি অংশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং আগুনের তাপে কয়েকজন শ্রমিক বের হওয়ার আগেই দগ্ধ হন।
কারখানার ভেতরে উপস্থিত কর্মীরা প্রথমে নিজেদের উদ্যোগেই আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় লোকজনও উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। আহত শ্রমিকদের দ্রুত কারখানা থেকে বের করে অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহনে করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সময়মতো হাসপাতালে নেওয়ায় দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বোয়ালখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন লিডার মোহাম্মদ আজাহার জানান, বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে তারা সেখানে পৌঁছানোর আগেই কারখানার কর্মী ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। ফলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা আশপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এড়ানো গেছে। এরপর ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি নিরাপদ নিশ্চিত করেন এবং সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট আগুনে ১১ জন শ্রমিক দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে ১০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের শরীরের বিভিন্ন অংশে দগ্ধের চিহ্ন রয়েছে এবং কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
দগ্ধ শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন দিদারুল আলম, উজ্জ্বল দাশ, মোহাম্মদ লিটন, সিরাজুল ইসলাম, জাহিদুল আলম, জাহিদ হোসেন, নূর নবী, মোহাম্মদ আলম, মাহামুদুল হক এবং সেলিম উদ্দিন। তারা বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম মহানগর, লোহাগাড়া, রাউজান, পটিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। আরেকজন আহত শ্রমিকের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) আলা উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে আনা শ্রমিকদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যাদের শরীরের বড় অংশ দগ্ধ হয়েছে, তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করছেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে আসেন। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামনে স্বজনদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার চিত্র দেখা যায়। চিকিৎসকদের কাছ থেকে আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে তাদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অনেকেই দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কারখানার একটি এসি ইউনিটে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন এবং কারখানা কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে।
শিল্প নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যকর রাখা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই দুর্ঘটনার সঠিক কারণ নির্ধারণ করে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকও খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত শেষে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এবং কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বোয়ালখালীর এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, শিল্পখাতে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। আহত শ্রমিকদের সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।