সর্বশেষ :
ইসরাইলের অকৃত্রিম মিত্র ভারত, ভ্যান্সের মন্তব্যে দ্বিমত নেতানিয়াহুর পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি শুরু: উত্তপ্ত বিচারিক অঙ্গন সৌরবিদ্যুতে গুরুত্ব, জ্বালানি আমদানির চাপ কমাতে চায় সরকার ডিসেম্বরেই নতুন বই, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুটিংহীন অবসরে যেভাবে নিজেকে সজীব রাখেন অভিনেত্রী হিমি আমানত আনতে ৪ কোটি টাকার ঘুষ: ডুবছে কমার্স ব্যাংক ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত ভারত: ১০ জনের মৃত্যু, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রেমিকার ঘরে স্ত্রীকে খুন, নেপাল পালানো স্বামী গ্রেফতার পল্লী উন্নয়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর: মির্জা ফখরুল ব্রাজিলকে বিদায় করে নতুন ইতিহাস লিখলেন আর্লিং হলান্ড

তেহরানে খামেনির শেষ বিদায়ে লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত ঢল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
তেহরানে খামেনির শেষ বিদায়ে লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত ঢল

প্রকাশ: ৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এক শোকাবহ ও মহাকাব্যিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির চূড়ান্ত বিদায়ে তেহরানের রাজপথ আজ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক মর্মান্তিক বিমান হামলায় নিহত হওয়ার কয়েক মাস পর, আজ সোমবার দেশটির সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষযাত্রার আয়োজন করেছে। ভোর ৬টায় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স থেকে শুরু হওয়া এই শোকযাত্রা যেন গোটা জাতির সম্মিলিত শোকের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। তেহরানের আকাশ-বাতাস আজ শোকার্ত মানুষের কান্নায় আর ‘প্রতিশোধ’ গ্রহণের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনির এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল ধর্মীয় কোনো আচার নয়, বরং এটি ইরানের বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অটুট শক্তির জানান দেওয়ার একটি কৌশলগত প্রদর্শনীও বটে। দীর্ঘ যুদ্ধ এবং তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা ইরানের মানুষ আজ তাদের প্রয়াত নেতার কফিনের পেছনে যেভাবে সমবেত হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এক স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড় হয়নি। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে শুরু করে আজাদি স্কয়ার পর্যন্ত প্রায় দশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথজুড়ে আজ মানুষের যে ঢল নেমেছে, তার বিশালতা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

শোকযাত্রার রুট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে দামাভান্দ স্ট্রিট, ইমাম হোসেইন স্কয়ার, ইনকিলাব স্ট্রিট এবং ঐতিহাসিক আজাদি বা ফ্রিডম স্ট্রিট। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের প্রতীক এই আজাদি স্কয়ারেই চূড়ান্তভাবে সমবেত হবেন লাখো মানুষ। কফিনটি একটি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মেহরাবাদ বিমানবন্দরের দিকে, যেখান থেকে পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতার জন্য তা স্থানান্তর করা হবে। কফিনটি ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো এবং তার ওপর রাখা হয়েছে খামেনির কালো পাগড়ি, যা তাঁর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতীকী চিহ্ন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। একই হামলায় নিহত হওয়া খামেনির পরিবারের সদস্যদের কফিনও তাঁর পাশেই রাখা হয়েছে, যা এই ট্র্যাজেডির গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে বিশ্বনেতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা তেহরানে এসে খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া এবং বিভিন্ন আরব দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই শোকের দিনে ইরানের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। রোববারের জানাজায় ইরানের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে সকলের নজর আটকে ছিল খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির ওপর, যিনি নিরাপত্তার খাতিরে জনসমক্ষে উপস্থিত হতে পারেননি বলে জানা গেছে। এছাড়া জানাজায় ইমামতি করেন প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি, যার কণ্ঠে ঝরে পড়েছে শোকাহত জাতির আর্তনাদ।

তেহরানের এই শোকযাত্রা কেবল আজকের দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। শোকানুষ্ঠানের পরবর্তী ধাপ হিসেবে আগামীকাল মঙ্গলবার পবিত্র নগরী কোমে বিশাল শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বুধবার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ এবং কারবালায়। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এই স্থানগুলোতে ইমাম আলী (আ.) এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাজারের পাশে খামেনির প্রতি শেষ সম্মান জানানো হবে। সেখানেও লাখো মানুষ ভিড় করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি যেন একটি বিজয় শোভাযাত্রার মতো করে সাজানো হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো শিয়া সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও ইরানের বিপ্লবী চেতনার মেলবন্ধন ঘটানো।

চূড়ান্তভাবে আগামী বৃহস্পতিবার ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে সমাহিত করা হবে। মাশহাদ তাঁর জন্মভূমি এবং আধ্যাত্মিক কেন্দ্রস্থল হওয়ার কারণে সেখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চেয়েছিলেন। তেহরান থেকে শুরু করে মাশহাদ পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের জন্য এক বিশাল পরীক্ষার ক্ষেত্র। এই শোক অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরতে পরতে তারা দেখাতে চায় যে, দেশটি বাইরের চাপ সত্ত্বেও একতাবদ্ধ এবং তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শ বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ইরানের সাধারণ মানুষ আজ শুধু একজন নেতাকে হারাচ্ছে না, বরং একটি যুগের অবসান প্রত্যক্ষ করছে। শোকের এই মিছিল থেকে ভেসে আসা ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগানগুলো প্রমাণ করে যে, এই শোকের শক্তি আগামী দিনে ইরানের বৈদেশিক নীতি এবং আঞ্চলিক অবস্থানে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশ্ব আজ উদ্বেগের সাথে তাকিয়ে আছে। আকাশচুম্বী এই জনসমাগম এবং ধর্মীয় আবেগপূর্ণ এই পরিবেশ প্রমাণ করে যে, আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের মানুষের হৃদয়ে এক গভীর রেখাপাত করে গেছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অমলিন থাকবে। পুরো পৃথিবী আজ প্রত্যক্ষ করছে এক শোকার্ত জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত