প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ আলোচনার জন্ম দেওয়া জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংর্কান্ত বিশেষ কমিটি আজ মঙ্গলবার তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রথম বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার লক্ষ্যে গঠিত এই বিশেষ কমিটির প্রথম এই বৈঠকে তাদের সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণীত বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব এবং বর্তমান নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রেক্ষাপটে এই কমিটির কাজ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেদিকে এখন সমগ্র দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।
গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে মোট ১২ জন সদস্যের সমন্বয়ে ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদ। মূলত সংবিধানের প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী সংশোধনীগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর ওপর বিস্তারিত সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে সুনির্দিষ্ট রিপোর্ট পেশ করাই এই কমিটির মূল কার্যপরিধি হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। তবে কমিটি গঠনের পর থেকে এর কার্যপ্রণালী, কর্মপন্থা এবং কত দিনের মধ্যে তারা তাদের প্রতিবেদন সংসদে পেশ করবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা বা সময়সীমা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি। আজকের প্রথম বৈঠকে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ কমিটির এই পথচলার পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পটভূমি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের অন্যতম ছিল অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা, জনমত জরিপ এবং অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর ওই কমিশন গত বছরের ৩১ জানুয়ারি তাদের সুদূরপ্রসারী সুপারিশমালা সরকারের কাছে জমা দিয়েছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে সেগুলোকে মূর্ত করে গড়ে তোলা হয় জুলাই জাতীয় সনদে। সেই সনদে সংবিধান সম্পর্কিত প্রায় আটচল্লিশটি মৌলিক প্রস্তাব স্থান পেয়েছিল, যার মধ্যে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মৌলিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জুলাই জাতীয় সনদের ওই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর পরবর্তীতে দেশজুড়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে হ্যাঁ সূচক রায় জয়ী হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বাস্তবায়ন আদেশের আলোকেই ওই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচিত বিএনপি সরকার সেই প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিরোধী দলের আপত্তি ও ভিন্নমতকে পাশ কাটিয়ে বর্তমান সরকার নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিশেষ করে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির জোটের সংসদ সদস্যরা গত সংসদেই এই কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন এবং কমিটি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করেছিলেন। তাদের মূল আপত্তি ছিল যে, জুলাই সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পন্থায় সংবিধান সংশোধন করা হলে তা জনমতের প্রতিফলন ঘটাবে না।
বিশেষ কমিটির সভাপতি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অবশ্য শুরু থেকেই বলে আসছেন যে, বর্তমান সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এর বাইরেও দলের নিজস্ব কিছু নির্বাচনী অঙ্গীকার রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন যে, এই বিশেষ কমিটি তাদের প্রথম বৈঠকের পর দেশের বরেণ্য সংবিধানবিশেষজ্ঞ, সিনিয়র আইনজীবী, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং সমাজের সর্বস্তরের বিশিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনায় বসবে। সবার মতামত ও পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করে তা সংসদে পেশ করা হবে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সেই সুপারিশ সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে, যার ওপর পরবর্তীতে সংসদীয় আলোচনা এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহিত হবে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে যে, এই বিশেষ কমিটি কি মূলত জুলাই সনদের সেই আটচল্লিশটি সাংধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করবে, নাকি সেগুলোকে কেবল গৌণ বিবেচনায় রেখে বিএনপির নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকেই নতুন করে সুপারিশমালা তৈরি করবে। বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে যে, তারা জুলাই জাতীয় সনদে ভিন্নমত পোষণ করে যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল, সেই আঙ্গিকে এবং নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির আলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সংবিধান সংস্কার করবে। অন্যদিকে, জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলোর দাবি হলো জনগণের বিপুল মতামতের ভিত্তিতে অর্জিত জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কারগুলো কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই দুই ভিন্ন মেরুর রাজনৈতিক অবস্থানের মাঝে বিশেষ কমিটি কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সংশয় ও কৌতূহল দুটোই সমানভাবে বিদ্যমান রয়েছে।
সব মিলিয়ে আজকের এই প্রথম বৈঠকটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা নয়, বরং আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনার মূল দলিল অর্থাৎ সংবিধানের ভাগ্য নির্ধারণে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এক মোড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সংকট দূর করতে এই কমিটি কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। জাতীয় জীবনের এই সংবেদনশীল মুহূর্তে দেশের আপামর জনসাধারণ একটি স্থিতিশীল, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশায় এই কমিটির প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।