বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় লাফ, সামনে নতুন শঙ্কা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭২ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ৬৩ ডলারে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআইয়ের দামও ৭১ সেন্ট বেড়ে ৮৩ দশমিক ৯১ ডলারে দাঁড়ায়। চলতি সপ্তাহে তেলের বাজারে যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, জলপথটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা এখনো তৈরি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে আগে যে সমঝোতার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সেই আশাবাদ দুর্বল হয়েছে। বাজারে এ ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকি হিসাব করতে শুরু করেন। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় তেলের ফিউচার বাজারে।

অস্ট্রেলিয়ার কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটেরারের মতে, বাজার এখনো সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে পুরোপুরি আশা হারায়নি। তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে। আলোচনা যত দীর্ঘায়িত হবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবিদাওয়া যত জটিল হবে, দ্রুত কার্যকর কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে বাজারের সংশয়ও তত বাড়বে।

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ব্যাপক পতন। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অতিক্রম করলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার মাত্র ১০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

জাহাজ চলাচলের এই পতন বাজারের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ তেলের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও তা যদি নিরাপদে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে বড় তেলবাহী জাহাজগুলো যদি নিরাপত্তা ঝুঁকি, বীমা ব্যয় এবং সম্ভাব্য হামলার কারণে জলপথ এড়িয়ে চলে, তাহলে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং সরবরাহের সময়ও দীর্ঘ হতে পারে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দোহা যত দ্রুত সম্ভব জলপথটি পুনরায় চালু দেখতে চায়। কিন্তু তেহরানের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার প্রশ্নটি অন্য আলোচনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ না হলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক নাও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হরমুজ প্রণালি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, জলপথটির ওপর ওয়াশিংটনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে বাস্তবে যুদ্ধের আগের তুলনায় জাহাজ চলাচল অত্যন্ত কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

তেলের বাজারে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি শুধু সরবরাহের তাৎক্ষণিক সংকটের প্রতিফলন নয়; ভবিষ্যতে কী হতে পারে, সেই আশঙ্কাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুঁকির মধ্যে থাকলে ব্যবসায়ীরা আগাম তেলের দাম বাড়িয়ে দেন। কারণ তারা ভবিষ্যতে সরবরাহ ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎসের ওপর অতিরিক্ত চাপের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ইআইএও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে তেলের বাজারের অন্যতম প্রধান অনিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করছে। ইআইএর পূর্ববর্তী পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার পর বাজার ধীরে ধীরে আগের অতিরিক্ত সরবরাহের অবস্থায় ফিরতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে বছরের শেষ দিকে ব্রেন্টের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই পূর্বাভাসের বড় অংশই সংঘাতের স্থায়িত্ব ও তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাত্রার ওপর নির্ভরশীল।

অর্থাৎ, কূটনৈতিক সমাধান হলে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি দ্রুত থেমে যেতে পারে। বিপরীতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও কমে গেলে তেলের বাজারে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলের দামে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেল বাজার বিশ্লেষক জুন গোহ মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির উভয় দিকে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওপেকভুক্ত দেশগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা থাকবে। তাঁর মতে, কূটনৈতিক আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে অবস্থান করতে পারে।

সব মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করার জন্য কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে জাহাজে হামলা ও সামরিক উত্তেজনা সেই আলোচনার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। ফলে বাজারে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তেলের উৎপাদন নয়, বরং উৎপাদিত তেল নিরাপদে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে কি না।

আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি আসে কি না—তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে তেলের পরবর্তী দিকনির্দেশনা। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো শক্তিশালী সংকেত এলে দাম আবার কমতে পারে। কিন্তু অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকলে ৯০ ডলারের আশপাশের বর্তমান মূল্য আরও ওপরে ওঠার ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত