প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সংকটে থাকা ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ঋণ দিতে ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ চেয়েছে ৩৮টি ব্যাংক। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
বন্ধ ও সংকটে পড়া কারখানা পুনরায় চালু করা এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর অংশ হিসেবে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের কথা রয়েছে। তবে তহবিলের সুদের হার নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল।
সুদের হার নিয়ে সেই বিরোধের সমাধান হওয়ার পর আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ঋণ বিতরণের পথ খুলেছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল জোগানদাতা ব্যাংকগুলোকে তার নীতি সুদহারের সঙ্গে ৫০ বেসিস পয়েন্ট যোগ করে অর্থ দেবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে নীতি সুদহারের সঙ্গে ৫০ বেসিস পয়েন্ট যোগ করলে প্রণোদনা তহবিলের বর্তমান ব্যয় দাঁড়ায় ১০ শতাংশ। গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানো হয়েছিল।
এর আগে প্রস্তাবিত সুদের হার ছিল ৯ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি কর্মকর্তাদের মতে, এই নির্ধারিত সুদের হারই ছিল মতবিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ।
নতুন কাঠামোয় নীতি সুদহার পরিবর্তিত হলে প্রণোদনা তহবিলের খরচও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় হবে। ফলে ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ানো বা কমানোর সঙ্গে সঙ্গে এ তহবিলের সুদের হারেও পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকগুলোকে একবারে পুরো অর্থ দেওয়া হবে না। তিন বছর ধরে পর্যায়ক্রমে তহবিল বিতরণ করা হবে। কোনো ব্যাংক কোনো গ্রাহকের জন্য ১০০ কোটি টাকা চাইলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই ঋণ বিতরণের জন্য পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে—এমন একটি ব্যাংকের সঙ্গে তাকে সমন্বয় করে দিতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাংকগুলোর দীর্ঘ সময়ের জন্য অর্থ আটকে থাকার যে আশঙ্কা ছিল, তিন বছর ধরে পর্যায়ক্রমে অর্থ বিতরণের কাঠামোর মাধ্যমে তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
এর আগে সুদের হার নিয়ে মতবিরোধ নিরসনে ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহমেদের সভাপতিত্বে ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি প্রধানদের সঙ্গে দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠকগুলোতে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত বা এডিআর সীমা ৬০-৭০ শতাংশ নাকি ৭০-৮০ শতাংশ রাখা হবে, তা নিয়ে মতবিভেদ দেখা দেয়।
তারল্য সহায়তা নিয়েও ব্যাংকারদের উদ্বেগ
সুদের হার নিয়ে সমাধান হলেও কর্মসূচি নিয়ে ব্যাংকারদের কিছু উদ্বেগ এখনো রয়েছে। বিশেষ করে, এই তহবিলের আওতায় দেওয়া ঋণের বিপরীতে কোনো তারল্য সহায়তা বা ‘লিকুইডিটি ব্যাকস্টপ’ পাওয়া যাবে না বলে আশঙ্কা করছেন ট্রেজারি কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় থাকা অংশ নগদ অর্থের সংকট দেখা দিলে রেপো অর্থায়নের জামানত বা কোল্যাটারাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
এ নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান বলেন, সাধারণত সরকারি সিকিউরিটিজ জামানত রেখে রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করে ব্যাংকগুলো। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে রিভার্স রেপোর মাধ্যমে অর্থ ধার নেয়। কিন্তু প্রস্তাবিত কাঠামোটি প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
আরেকজন জ্যেষ্ঠ ট্রেজারি কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করলে ব্যাংকগুলো নির্ধারিত রিটার্ন পায়। কিন্তু এই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দেওয়া অর্থ বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর হিসাবের খাতায় এটিকে কীভাবে দেখানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
একজন ট্রেজারি কর্মকর্তা ধারণা করছেন, অর্থটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ‘প্লেসমেন্ট’ হিসেবে রেকর্ড করা হতে পারে।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজে যা থাকছে
সরকারের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর পুনঃঅর্থায়ন তহবিল হিসেবে রাখা হয়েছে।
এই ৪১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ব্যাংকিং সংকট, জ্বালানি ঘাটতি ও মূলধন সংকটে পড়া বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের ব্যবসা পুনরায় চালুর জন্য।
এ ছাড়া ৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতে, ১০ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে, ৩ হাজার কোটি টাকা কৃষি-হাব গঠনে এবং আরও ৩ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্যাকেজের বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করবে। এ অর্থের একটি অংশ প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইনান্সিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়া পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ঋণ, কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বেকারদের ঋণ এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামীণ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অর্থ ব্যবহার করা হবে।
ঋণের সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল জোগানদাতা ব্যাংকগুলোকে নীতি সুদহারের চেয়ে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বেশি হারে অর্থ দেবে। বর্তমানে সেই হার ১০ শতাংশ।
তবে ব্যাংকগুলো যখন গ্রাহকদের জন্য এই তহবিল ব্যবহার করবে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছ থেকে ৪ শতাংশ হারে চার্জ নেবে। আর চূড়ান্ত ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ বা মুনাফা নিতে পারবে।
কিছু নির্দিষ্ট খাতে সুদের হার আরও কম হতে পারে। বিশেষ করে স্টার্টআপ খাতে ঋণের সুদ সর্বনিম্ন ৪ শতাংশ পর্যন্ত নামতে পারে। এ ক্ষেত্রে সুদের হারের ঘাটতি সরকার বাজেট থেকে ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড় লক্ষ্য
প্রণোদনা প্যাকেজের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো কয়েক বছর ধরে দুর্বল হয়ে থাকা অভ্যন্তরীণ চাহিদা পুনরুজ্জীবিত করা। একই সঙ্গে বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা কারখানা চালু করে শিল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও কর্মসূচিটির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত হলে এই বড় আকারের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বেসরকারি খাতে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
৩৮টি ব্যাংকের ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ চাওয়ার মধ্য দিয়ে সংকটে থাকা ব্যবসায় অর্থায়নের বিষয়ে ব্যাংকিং খাতের আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে কর্মসূচিটির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে ঋণ বিতরণের গতি, প্রকৃত সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পৌঁছানো এবং ঋণের অর্থ উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে যথাযথভাবে ব্যবহারের ওপর।