প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডারউইনে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর বাংলাদেশ দলের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও নির্ধারণী টেস্টে চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের স্বপ্ন দেখছে টাইগাররা। অন্যদিকে প্রথম টেস্টের হারের ধাক্কা কাটিয়ে সিরিজে সমতা ফেরাতে মরিয়া স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া।
ডারউইনে বাংলাদেশের নয় উইকেটের জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটেও সেটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ঢাকা থেকে দ্বিতীয় টেস্ট কাভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের কাছে অস্ট্রেলিয়ার সাংবাদিকদের আগ্রহ ছিল বাংলাদেশের উদযাপন নিয়ে। ঢাকার রাস্তায় মিছিল হয়েছে কি না, পত্রিকায় কত বড় শিরোনাম হয়েছে, মোটর শোভাযাত্রা হয়েছে কি না—এসব জানতে চেয়েছেন তাঁরা।
এসব প্রশ্নের মধ্যেই ফুটে উঠেছে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানোর গুরুত্ব। টেস্ট অভিষেকের ২৬ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বিরাট অর্জন। তবে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটমহলে শুধু বিস্ময় নয়, তৈরি হয়েছে উদ্বেগও। দ্বিতীয় টেস্টেও বাংলাদেশ জিতে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের মধ্যেও দ্বিতীয় টেস্ট জয়ের আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে। ডারউইন টেস্টের জয়ের অন্যতম নায়ক হাসান মাহমুদ মনে করেন, পেস ও বাউন্সে ভরা উইকেটেও বাংলাদেশের বোলিং ইউনিট ভালো করতে সক্ষম।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সাফল্যের ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। ২০০৫ সালে কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০১৭ সালে দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারায় টাইগাররা। ২০২১ সালে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ও বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সিরিজও জেতার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে।
সিরিজ নির্ধারণী দ্বিতীয় টেস্টের আগে বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স অবশ্য অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখাতে নারাজ। বৃহস্পতিবার ম্যাকাইয়ে ম্যাচ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি নতুন ম্যাচ এবং কন্ডিশনও ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়া কঠিনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। বাংলাদেশ নিজেদের প্রক্রিয়া অনুযায়ী খেলতে চায় এবং তিনি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচের প্রত্যাশা করছেন।
অস্ট্রেলিয়াও যে ঘুরে দাঁড়াতে প্রস্তুত, তাদের অনুশীলনেই তার প্রমাণ মিলেছে। ম্যাকাইয়ে পৌঁছানোর পরদিন থেকেই স্বাগতিকরা কঠোর অনুশীলন শুরু করেছে। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত টানা অনুশীলন করেছে তারা। ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ছিল বাড়তি মনোযোগ।
বিশেষ করে বোলারদের ব্যাটিং অনুশীলন ছিল চোখে পড়ার মতো। টানা প্রায় দুই ঘণ্টা বোলিং করার পর আরও প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাটিং করেন তাঁরা। এর পেছনে কারণও রয়েছে। ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়ার জন্য সমস্যা তৈরি করেছিল।
প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদ ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের সঙ্গে ব্যাটিং করে মেহেদী হাসান মিরাজ খেলেন ৬৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি এবং নাজমুল হোসেন শান্ত ও মিরাজের অর্ধশতকে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে।
বল হাতেও মিরাজ ছিলেন দুর্দান্ত। দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর পাঁচ উইকেটের সুবাদে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে আটকে দেয় বাংলাদেশ। এরপর মাত্র ৫৬ রানের লক্ষ্য মুমিনুল হকরা সহজেই পেরিয়ে যান। নয় উইকেটের সেই জয়ই এখন দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের প্রধান ভিত্তি।
ম্যাকাইয়ের কন্ডিশন বিবেচনায় বাংলাদেশের একাদশেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবল বাতাস, তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়া এবং পেস ও বাউন্স সহায়ক উইকেটের কারণে চার পেসার নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা করতে পারে বাংলাদেশ।
প্রথম অনুশীলনেই বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম প্রায় দেড় ঘণ্টা বোলিং করেন। হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ, খালিদ আহমেদ ও এবাদত হোসেনও টেস্টের উপযোগী দীর্ঘ স্পেল করেন। চার পেসার খেলানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কোচ সিমন্স সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। একাদশ ম্যাচের আগের দিন চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ম্যাকাইয়ের উইকেট নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। রেড ব্যারিয়ার অ্যারেনার হ্যারাপ পার্কে প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উইকেটটি ব্রিসবেনের গ্যাবার আদলে তৈরি করা হয়েছে এবং এর কিউরেটরও গ্যাবা থেকে এসেছেন। ফলে পেস ও বাউন্সের বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কন্ডিশন নিয়ে বাংলাদেশের কোচ খুব বেশি চিন্তিত নন। সিমন্সের মতে, ডারউইনের উইকেটও ব্যাটিংয়ের জন্য খুব সহজ ছিল না। সেখানে বাংলাদেশ খেলতে পারলে ম্যাকাইয়ের উইকেট নিয়েও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও কন্ডিশনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। নেট অনুশীলনের সময় সাদমান ইসলাম শরিফুল ইসলামকে পরামর্শ দিয়েছেন, ম্যাকাইয়ের উইকেটে বল এমনিতেই বাউন্স করবে। তাই বাউন্স করানোর চেয়ে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমও পেসার হাসান মাহমুদকে বাতাসের বিষয়টি মাথায় রেখে বোলিংয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রবল বাতাসের কারণে রিভার্স সুইং করানো কঠিন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট একটি চ্যানেলে ধারাবাহিকভাবে বোলিং করা কার্যকর হতে পারে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই ম্যাচটি শুধু সিরিজ বাঁচানোর লড়াই নয়, ডারউইনের হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগও। ম্যাকাইয়ে দেশের ১২তম টেস্ট ভেন্যুর অভিষেককে স্মরণীয় করে রাখতে জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবছে না স্বাগতিকরা।
দুই দলেই একাধিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ তিন পেসার নিয়ে খেললে তাসকিন আহমেদকে বিশ্রাম দিয়ে শরিফুল ইসলামকে একাদশে নেওয়া হতে পারে। চার পেসার খেলানো হলে বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলামকে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে থাকতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে ম্যাকাইয়ের দ্বিতীয় টেস্টে লড়াইটি হতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন মানসিকতার দলের। একদিকে ইতিহাস গড়ে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ, অন্যদিকে ঘরের মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া অস্ট্রেলিয়া। ডারউইনের জয়কে সিরিজ জয়ের মুকুটে পরিণত করতে বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন আরেকটি বড় পারফরম্যান্স।