আজ জাতিসংঘের সভাপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন খলিলুর রহমান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
আজ জাতিসংঘের সভাপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন খলিলুর রহমান

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিউইয়র্কে আজ মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এই অধিবেশনের মধ্য দিয়ে এক বছরের জন্য জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিনিধিত্বশীল বহুপক্ষীয় ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই অধিবেশন চলবে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত।

বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব গ্রহণের ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চে দেশের নেতৃত্বের সক্ষমতারও বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি এই মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একই সময়ে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও সংস্কার নিয়েও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নানা মতপার্থক্য রয়েছে।

এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা : সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ।’ এই প্রতিপাদ্যের মধ্যেই বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ প্রতিফলিত হয়েছে। জাতিসংঘের নিজস্ব তথ্যেও বলা হয়েছে, ৮১তম অধিবেশনের মূল ভাবনা হলো আস্থা পুনরুদ্ধার এবং এমন একটি জাতিসংঘ নিশ্চিত করা, যা সব মানুষের জন্য কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।

খলিলুর রহমান গত ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। গোপন ব্যালটে তিনি ৯৯ ভোট পান। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস কাকোরিস পান ৯১ ভোট। মোট ১৯০টি ভোট পড়েছিল। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত পালায় বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি পাঁচটি আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মধ্যে পর্যায়ক্রমে বণ্টিত হয়। ৮১তম অধিবেশনের জন্য সভাপতির পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল। বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া তাই দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। জাতিসংঘের নথিতেও তাঁকে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচিত হওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণের আগে খলিলুর রহমান জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং জাতিসংঘের সামনে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর খলিলুর রহমানের সামনে বড় একটি দায়িত্ব হবে সাধারণ পরিষদের আলোচনা ও কার্যক্রমকে কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভারসাম্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্বের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট নিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলো এই ফোরামে আলোচনা করে।

খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর অগ্রাধিকারের বিষয়ে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, সেখানে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গতি বাড়ানো, জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষা, মানবাধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির সুশাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এসব অগ্রাধিকার বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বিশেষ করে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের বিষয়টি তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ার পাশাপাশি জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ফলে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব শুধু সভা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও সংলাপ ও সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে।

এবারের অধিবেশন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সাধারণ পরিষদের সভাপতিরও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা রয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্বের এই প্রক্রিয়া তাঁর উত্তরসূরি খলিলুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেছেন।

ফলে আগামী এক বছর খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে শুধু নিয়মিত বৈশ্বিক ইস্যু নয়, নেতৃত্ব পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক শান্তি, উন্নয়ন, মানবিক সংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামলাতে হবে।

বাংলাদেশের জন্যও এই দায়িত্বের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থেকে এসব ইস্যুতে ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন খলিলুর রহমান।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অধিবেশন নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৩টায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং এর সভাপতিত্ব করবেন খলিলুর রহমান।

বাংলাদেশের জন্য তাই আজকের দিনটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। প্রায় চার দশক পর একজন বাংলাদেশি আবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসছেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে যখন সংঘাত ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন আস্থা পুনর্গঠন, সংলাপ জোরদার এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে কার্যকর করার প্রত্যাশা নিয়েই শুরু হচ্ছে তাঁর নেতৃত্বাধীন ৮১তম অধিবেশন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত