প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার ব্যবহার যত দ্রুত বাড়ছে, সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের সক্ষমতা। এক দশকের ব্যবধানে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বিস্তারের কারণে সামনে চাহিদা আরও দ্রুত বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন আন্তর্জাতিক সংযোগ ও সাবমেরিন কেবল স্থাপনের উদ্যোগের বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ২০১৫ সালে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ছিল মাত্র ১৪১ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড বা জিবিপিএস। ২০২৬ সালে এসে সেই চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড বা টিবিপিএসে। অর্থাৎ ১১ বছরে চাহিদা বেড়েছে ৯৫ গুণেরও বেশি। অন্যদিকে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার প্রায় আড়াই থেকে তিন বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ হওয়ার দিকে এগোচ্ছে।
বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৮ সালে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন প্রায় ২৭ টিবিপিএসে পৌঁছাতে পারে। ২০৩০ সালে তা ৫৪ টিবিপিএস ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। আরও দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে ২০৩২ সালে প্রয়োজন হতে পারে ১০৮ টিবিপিএস এবং ২০৩৪ সালে ২১৬ টিবিপিএস। ২০৩৫ সালে চাহিদা প্রায় ৩০৫ টিবিপিএসে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে।
এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের বড় অংশ এখনো সীমিত কয়েকটি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে দেশের প্রধান সাবমেরিন সংযোগ সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। সি-মি-উই-৪ বাংলাদেশে যুক্ত হয় ২০০৫ সালে। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহারের ফলে কেবলটির বয়স এখন দুই দশকের কাছাকাছি। এর কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পুরোনো অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সি-মি-উই-৫ অপেক্ষাকৃত নতুন হলেও এর ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতার বড় অংশ ইতোমধ্যে কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটাতে শুধু বিদ্যমান দুটি কেবলের ওপর নির্ভর করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
দেশের আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের একটি বড় অংশ এখন স্থলপথে, বিশেষ করে ভারত হয়ে আসছে। নতুন সাবমেরিন কেবল সময়মতো চালু না হলে এই নির্ভরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, কোনো একটি দেশের স্থলভিত্তিক সংযোগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শুধু ব্যবসায়িক নয়, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের তুলনায় এ অঞ্চলের অনেক দেশ আন্তর্জাতিক সংযোগে অনেক বেশি বৈচিত্র্য তৈরি করেছে। ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিক সাবমেরিন কেবল যুক্ত রয়েছে। ফলে একটি কেবল বা একটি রুটে সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প সংযোগ ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বিকল্প পথের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
নতুন সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের একটি প্রকল্পও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে সামিট কমিউনিকেশনস, সিডিনেট কমিউনিকেশনস ও মেটাকোর সাবকমকে সাবমেরিন কেবল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের লাইসেন্স দেওয়া হয়। পরে তিন প্রতিষ্ঠান মিলে বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম বা বিপিসিএস কনসোর্টিয়াম গঠন করে।
প্রকল্পটির রুট জরিপসহ বেশ কিছু প্রাথমিক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কেবল স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কারিগরি ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ার পরও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, কেবল স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অনুমোদনের বিষয় রয়েছে। কয়েকটি সরকারি সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলেও কিছু ছাড়পত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকল্পের সময়সূচি অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক ও তথ্যনিরাপত্তার বিষয়। প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার চীনা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, কেবল স্থাপনের সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকলেও সক্রিয় নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা প্রযুক্তিগত ও নীতিগতভাবে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে বলে তাঁদের মত।
সরকারি পর্যায়ে নতুন সক্ষমতার অন্যতম বড় প্রত্যাশা সি-মি-উই-৬কে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই তৃতীয় সাবমেরিন কেবল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরি কাজ এগিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও নির্ধারিত সময়ে বাণিজ্যিকভাবে সংযোগ চালু করা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সি-মি-উই-৬ চালু হলে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় প্রায় ১৭ টিবিপিএস পর্যন্ত নতুন সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩০ টিবিপিএস অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের চূড়ান্ত সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের হিসাব নির্ভর করবে কেবলটির নকশা, লিটআপ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ওপর।
তবে নতুন কেবল যুক্ত হলেও শুধু একটি প্রকল্প দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা যে গতিতে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন সক্ষমতার একটি বড় অংশও ব্যবহৃত হয়ে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই একাধিক সাবমেরিন কেবল, আন্তর্জাতিক স্থল সংযোগ এবং বিকল্প রুট নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ব্যান্ডউইথের বিষয়টি সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে হয়তো কেবল ইন্টারনেটের গতি বা দামসংক্রান্ত বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে দেশের পুরো ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ জড়িত। একটি নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংযোগ ছাড়া আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদান, ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সফটওয়্যার রপ্তানি এবং ডেটা সেন্টার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন আন্তর্জাতিক সার্ভার ও প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে কাজ করছেন। একইভাবে ব্যাংকিং, ই-কমার্স, টেলিমেডিসিন, অনলাইন শিক্ষা ও সরকারি ডিজিটাল সেবার পরিধিও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংযোগে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা দিলে এসব খাতের কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা-নির্ভর অর্থনীতির বিস্তার ঘটাতে হলে শুধু মোবাইল নেটওয়ার্ক বা স্থানীয় ফাইবার অবকাঠামো উন্নত করলেই হবে না। দেশের আন্তর্জাতিক ডেটা সংযোগকে একই সঙ্গে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী করতে হবে। একটি মাত্র রুট বা সীমিত কয়েকটি কেবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন সাবমেরিন কেবল স্থাপনের পাশাপাশি পুরোনো কেবলগুলোর সক্ষমতা, বিকল্প স্থলপথ, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে এবং দুর্যোগকালীন ব্যাকআপ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ব্যান্ডউইথের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি এখন আর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমস্যা নয়; এটি ইতোমধ্যে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর সামনে বাস্তব চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৪১ জিবিপিএস থেকে ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টিবিপিএসে পৌঁছে যাওয়া চাহিদাই তার প্রমাণ।
সামনে যখন কয়েক বছরের ব্যবধানে এই চাহিদা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন নতুন সক্ষমতা তৈরিতে দীর্ঘসূত্রতা দেশের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথকে শুধু টেলিযোগাযোগ খাতের একটি প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, তথ্যনিরাপত্তা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সময়মতো নতুন কেবল ও বিকল্প আন্তর্জাতিক সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হতে পারে; আর সিদ্ধান্তে বিলম্ব হলে বাড়তে পারে নির্ভরতা ও ঝুঁকি।