শর্ত না মানায় বাড়তি দামে গ্যাস বিল দেবে না বিসিআইসি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
শর্ত না মানায় বাড়তি দামে গ্যাস বিল দেবে না বিসিআইসি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও সেই অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় উৎপাদন বন্ধ থাকার সময় কারখানা সংরক্ষণে ব্যবহৃত গ্যাসের জন্যও বর্ধিত দাম পরিশোধ করতে রাজি নয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। সংস্থাটি দাবি করেছে, নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় প্লান্ট প্রিজারভেশনের কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের বিল আগের দরে নির্ধারণ করা উচিত।

বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন চারটি ইউরিয়া সার কারখানাকে ঘিরে এ বিরোধ তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এসব কারখানায় উৎপাদন সচল রাখার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে গ্যাসের ঘাটতির কারণে বছরের উল্লেখযোগ্য সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অথচ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার যন্ত্রপাতি ও প্লান্ট সচল অবস্থায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করতে হয়।

এই অবস্থায় প্লান্ট সংরক্ষণে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ২৫ পয়সার পরিবর্তে আগের নির্ধারিত ১৬ টাকা করার দাবি জানিয়েছে বিসিআইসি। বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংস্থাটি।

বিসিআইসির বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় পেট্রোবাংলা বিভিন্ন সময়ে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয় কিংবা পুরোপুরি বন্ধ রাখে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানাগুলো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় রাখা যায় না।

সার উৎপাদনের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও অন্যান্য উপাদান কারখানার যন্ত্রপাতিতে ক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে। তাই উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্লান্ট সংরক্ষণ করতে হয়। এই সংরক্ষণ কার্যক্রমে প্রয়োজন হয় গ্যাসের। ফলে উৎপাদন না থাকলেও কারখানাগুলোর গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকে এবং সেই গ্যাসের বিলও পরিশোধ করতে হয়।

বিসিআইসি জানিয়েছে, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানা থেকে বছরে ন্যূনতম ১৮ লাখ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে বছরে ৩৩০ দিন ৭০ শতাংশ লোডে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত সাত কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির খরচ বিবেচনায় নিয়ে সার কারখানায় সরবরাহ করা মিশ্রিত গ্যাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় পেট্রোবাংলা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় ব্যয় প্রায় ২৮ টাকা ৭৮ পয়সা ধরে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। পরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মূল্যায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশীয় ও আমদানিকৃত গ্যাসের মিশ্রিত গড় ক্রয়মূল্য প্রতি ঘনমিটারে ২১ টাকা ১৫ পয়সা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে শেষ পর্যন্ত সার কারখানার জন্য গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ২৫ পয়সা। একই সঙ্গে চারটি সার কারখানায় ৭০ শতাংশ লোডে বছরে অন্তত ৩৩০ দিন গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিসিআইসির অভিযোগ, দাম বাড়ানোর অন্যতম ভিত্তি ছিল এই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের শর্ত। কিন্তু বাস্তবে সেই শর্ত পূরণ হয়নি।

মূল্যবৃদ্ধির আগে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বিসিআইসি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট বা এমএমসিএফডি গ্যাস নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা হলে এবং বছরে ৩৩০ দিনের হিসাব ধরে গ্যাসের দাম যৌক্তিকভাবে বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু সরবরাহ এর চেয়ে কম হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ১৬ টাকা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

বিসিআইসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে চারটি সার কারখানা প্লান্ট প্রিজারভেশনের কাজে মোট প্রায় চার কোটি ৬৬ লাখ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছে। বর্তমান নির্ধারিত ২৯ টাকা ২৫ পয়সা দরে এই গ্যাসের মূল্য প্রায় ১৩৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। একই পরিমাণ গ্যাস আগের ১৬ টাকা দরে হিসাব করলে মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু প্লান্ট সংরক্ষণের গ্যাসেই দুই দরের ব্যবধানে প্রায় ৬২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

কারখানাভেদে উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও ছিল দীর্ঘ। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানা গত অর্থবছরে ৩২ দিন বন্ধ ছিল। শাহজালাল সার কারখানা বন্ধ ছিল ৪৪ দিন। যমুনা সার কারখানা ১৬৪ দিন এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কারখানা ১৭৩ দিন বন্ধ ছিল। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পরিচালন ব্যয় এবং প্লান্ট সংরক্ষণের খরচ অব্যাহত ছিল।

সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর ইতিহাসও এ বিরোধের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। বিসিআইসির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের শর্তে সার কারখানার গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও প্রত্যাশিত মাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে আবারও দাম বাড়ানো হয়।

বিসিআইসির যুক্তি হলো, বাড়তি দাম গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা মূলত নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করেছিল। কিন্তু সরবরাহের ক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর পরও বন্ধ কারখানায় সংরক্ষণ কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের জন্য সর্বোচ্চ দাম পরিশোধের দাবি যুক্তিসংগত নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।

এদিকে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি শুধু সার কারখানার সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের সরবরাহ সংকটের অংশ বলে মনে করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। একই সঙ্গে বর্ধিত গ্যাসের দাম এবং সরবরাহের শর্ত নিয়ে কোনো পক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে তা আইনগতভাবে নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।

বিইআরসির সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যমান আইনে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পক্ষ বা লাইসেন্সধারী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশনের কাছে আবেদন করতে পারে। অভিযোগ বা আবেদন পাওয়ার পর কমিশন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কোনো পক্ষ কমিশনের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় পুনর্বিবেচনার সুযোগও রয়েছে।

গ্যাসের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে এই বিরোধের প্রভাব শুধু বিসিআইসির আর্থিক হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের কৃষি উৎপাদনের জন্য ইউরিয়া সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো উৎপাদন করতে না পারলে আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে। আবার উৎপাদন বন্ধ থাকা অবস্থায়ও যদি কারখানাগুলোকে বড় অঙ্কের গ্যাস বিল ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

অন্যদিকে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ ছাড়া সার কারখানাগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা কঠিন। ফলে একদিকে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা—দুই দিকেই ভারসাম্য প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সার কারখানার জন্য গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু গ্যাসের ক্রয়মূল্য বিবেচনা করলেই হবে না; সরবরাহের নিশ্চয়তা, কারখানার উৎপাদনক্ষমতা, জাতীয় সার চাহিদা এবং আমদানির বিকল্প ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশীয় উৎপাদন বন্ধ হলে পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে বিসিআইসি যে অবস্থান নিয়েছে, তার মূল প্রশ্ন হলো—যে শর্তের ভিত্তিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল, সেই শর্ত পূরণ না হলে একই হারে বিল নেওয়া কতটা যৌক্তিক। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, বিইআরসি ও বিসিআইসির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে।

দেশের সার উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখা এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে গ্যাস সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। কারণ উৎপাদন বন্ধ থাকলে একদিকে কৃষিখাতে সার সরবরাহের চাপ বাড়ে, অন্যদিকে কারখানাগুলোকে উৎপাদন ছাড়াই বড় ধরনের পরিচালন ব্যয় বহন করতে হয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন অথবা সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ—যে পথই নেওয়া হোক, দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এখন জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত