সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা, বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের সুবিধা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা, বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের সুবিধা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ ঘিরে নতুন একাধিক সুবিধার খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণ। নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হলে প্রথম থেকে ২০তম—সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দাপ্তরিক যোগাযোগ, মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং ইন্টারনেটনির্ভর সরকারি কার্যক্রমের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এতদিন নির্দিষ্ট কয়েকটি গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মোবাইল ভাতা পেতেন। নতুন ব্যবস্থায় সেই সীমাবদ্ধতা থাকছে না। ফলে সরকারি চাকরিতে তুলনামূলক নিচের গ্রেডে থাকা কর্মচারীরাও প্রথমবারের মতো এ ধরনের ভাতার সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে দৈনন্দিন দাপ্তরিক যোগাযোগের জন্য ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কর্মীদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের মাধ্যমে মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানোর বিষয়টি সামনে আসে। নতুন বেতন কাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা আরও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় প্রথম থেকে তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১ হাজার টাকা করে মোবাইল ভাতা পান। অর্থাৎ এতদিন এ সুবিধা মূলত উচ্চতর গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সরকারি কাজের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় এখন মাঠপর্যায়ের কর্মচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকেও নিয়মিত মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে।

সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ, অনলাইন সভায় অংশগ্রহণ, বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পরিচালনা এবং সরকারি তথ্য আদান-প্রদানে মোবাইল ফোনের ব্যবহার এখন অনেকটাই নিয়মিত। ফলে শুধু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য নয়, অন্যান্য গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও মোবাইল যোগাযোগের ব্যয়কে দাপ্তরিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫-এর সুপারিশে মোবাইল ভাতা আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব ছিল। সেই সুপারিশ অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে দশম গ্রেডের কর্মচারীদের মাসে ৫০০ টাকা এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মাসে ৪০০ টাকা করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি প্রথম থেকে তৃতীয় গ্রেডে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে ১ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল।

কমিশনের প্রস্তাবিত হারে মোবাইল ভাতা বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ত। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশন বাদে বছরে প্রায় ৬০৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব উঠে আসে। এ কারণে সরকারের ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়ে ভাতার হার পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করে সচিব কমিটি।

সচিব কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ সব গ্রেডকে ভাতার আওতায় আনার বিষয়টি বহাল থাকলেও ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে বিভিন্ন গ্রেডে ভাতার হার কমানোর প্রস্তাব এসেছে।

এখানে ভাতার আওতা সম্প্রসারণ এবং নির্দিষ্ট হারের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা জরুরি। সব গ্রেডকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নতুন বেতন কাঠামোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলেও সচিব কমিটির প্রস্তাবিত হার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত ও বিধি অনুসরণ করা হবে। ফলে কর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হলেও চূড়ান্তভাবে কোন গ্রেডে কত টাকা দেওয়া হবে, তা বাস্তবায়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমান সময়ে সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগের ধরন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। আগে যেখানে অফিসের টেলিফোন বা সরাসরি যোগাযোগের ওপর নির্ভরতা বেশি ছিল, এখন মোবাইল ফোন, মেসেজিং সেবা, ই-মেইল, অনলাইন সভা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সরকারি কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় কর্মীদের নিজস্ব মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন বেতনস্কেলের আওতায় শুধু মোবাইল ভাতাই নয়, সরকারি কর্মচারীদের জন্য আরও কিছু নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা অন্যতম। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। নতুন বেতন কাঠামোতে প্রথমবারের মতো এ ধরনের সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনস্কেল কার্যকরের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংশ্লেষ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন কাঠামোর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে।

নতুন বেতনস্কেলের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে প্রায় সোয়া নয় লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও নতুন কাঠামোর বিভিন্ন সুবিধার আওতায় আসবেন। ফলে নতুন পে স্কেলের প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও এর আর্থিক প্রভাব পড়বে।

দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতা পুনর্নির্ধারণের দাবি ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভরতার প্রসার—সব মিলিয়ে সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধার কাঠামো সময়োপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। নতুন পে স্কেলে মোবাইল ভাতা সব গ্রেডে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনেরই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এ উদ্যোগের গুরুত্ব আলাদা। কারণ তাদের অনেকেই দাপ্তরিক প্রয়োজনে নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও এতদিন এ ব্যয়ের বিপরীতে আলাদা কোনো ভাতা পেতেন না। নতুন ব্যবস্থায় তারা ভাতার আওতায় এলে ব্যক্তিগত আয়ের একটি অংশ দাপ্তরিক যোগাযোগের পেছনে ব্যয় করার চাপ কিছুটা কমতে পারে।

তবে একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সব কর্মচারীকে ভাতার আওতায় আনলে সরকারের নিয়মিত ব্যয় বাড়বে। তাই সচিব কমিটির সুপারিশে ভাতার পরিমাণ কমিয়ে আওতা বিস্তৃত করার যে ধারণা এসেছে, সেটিকে ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সুবিধার কাঠামোয় বেশ কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মধ্যে সব গ্রেডে মোবাইল ভাতার সুযোগ তৈরি হওয়া কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের সময় ভাতার হার, পরিশোধ পদ্ধতি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় স্পষ্ট হলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এর প্রকৃত আর্থিক প্রভাব আরও পরিষ্কার হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত