প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারে বার্ষিক ভ্রমণে যাওয়ার পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার জিংলাতলী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি বাস খাদে পড়ে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর ভোররাতে মহাসড়কের ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৪টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই সময় বাসটিতে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারা কলেজের বার্ষিক ভ্রমণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ে মোট চারটি বাস বরিশাল থেকে রওনা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বাস দাউদকান্দির জিংলাতলী এলাকায় পৌঁছানোর পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় দাউদকান্দি হাইওয়ে থানা পুলিশ। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পুলিশ বাসের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীদের বের করে আনে। দুর্ঘটনার আকস্মিকতায় অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আহতদের প্রাথমিকভাবে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। গুরুতর আহতদের মধ্যে নয়জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার সহকারী উপপরিদর্শক নূর উদ্দিন বাহার জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০ জন আহত হয়েছেন। নয়জনকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাওয়াত, ফেরদৌস, কৌশি, মিরাজ, মুরসালিন, ইমন মৃধা, আরিফ, শফিকুল ইসলাম, মালিহা মেহনাজ, রায়হান, সাজিয়া, তাসপিয়া, আরিফুল ইসলাম, সামিউল, রাজর্ষি, তাসনীম, হুমায়রা, মিলা, নিসা ও তানজিনা রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছরের মতো এবারও বার্ষিক ভ্রমণের আয়োজন করেছিলেন। দীর্ঘ যাত্রার অংশ হিসেবে সোমবার রাতে তারা কয়েকটি বাসে করে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। রাত পেরিয়ে ভোরের দিকে বাসগুলো কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় পৌঁছায়। তখনই একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।
রাতের দীর্ঘ যাত্রায় মহাসড়কে যানবাহনের চলাচলও ছিল। দুর্ঘটনার পর বাসটি খাদে পড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয়রাও উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করেন।
সড়ক দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। আহতদের কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নয়জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুর্ঘটনায় কারও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে আহতদের মধ্যে কয়েকজনের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাদের ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের এ ধরনের শিক্ষা সফর সাধারণত আনন্দ ও পারস্পরিক বন্ধন বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু যাত্রাপথে দুর্ঘটনা পুরো আয়োজনকে মুহূর্তেই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় পরিণত করেছে। সহপাঠীদের কেউ আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে ভোররাতে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ায় অনেক পরিবার উৎকণ্ঠার মধ্যে সন্তানদের খোঁজ নিতে শুরু করেন।
বাংলাদেশে দূরপাল্লার সড়কযাত্রায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রাতের যাত্রায় চালকের ক্লান্তি, অতিরিক্ত গতি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সড়কের পরিস্থিতি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে দূরপাল্লার শিক্ষা সফর বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে তাই চালকের বিশ্রাম, গাড়ির ফিটনেস, নির্ধারিত গতিসীমা এবং যাত্রাপথে পর্যাপ্ত বিরতির বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দাউদকান্দির জিংলাতলী এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাও দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। একটি বাসে ৪০ জন শিক্ষার্থী থাকার কারণে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রমও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সৌভাগ্যক্রমে দ্রুত পুলিশ ও স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। প্রাথমিকভাবে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার কথা জানা গেলেও কী কারণে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন, তা বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে। বাসটির গতি, চালকের শারীরিক অবস্থা, গাড়িটির যান্ত্রিক সক্ষমতা এবং দুর্ঘটনার সময় সড়কের পরিস্থিতিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
একটি আনন্দঘন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা শিক্ষার্থীদের জন্য এই দুর্ঘটনা নিঃসন্দেহে ছিল আকস্মিক ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী বা পর্যটকদের বহনকারী দূরপাল্লার বাসযাত্রায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি না ঘটলেও ২০ শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার ঘটনা সংশ্লিষ্টদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। একটি দুর্ঘটনা শুধু আহত ব্যক্তিদেরই নয়, তাদের পরিবার, সহপাঠী ও পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই আনন্দের ভ্রমণ যেন কোনো পরিবারের জন্য দুঃসংবাদে পরিণত না হয়, সে জন্য সড়ক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।