শজিমেকে এসির চেয়ে ৯ গুণ ব্যয়বহুল সাবস্টেশন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৫ বার
শজিমেকে এসির চেয়ে ৯ গুণ ব্যয়বহুল সাবস্টেশন

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে (শজিমেক) তিনটি গ্যালারিতে ২৪টি এসি স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৭৩ লাখ ১৪ হাজার ৫২০ টাকা। কিন্তু এসব এসি চালু করতে যে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে, তার ব্যয়ই প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এসি স্থাপনের ব্যয়ের তুলনায় প্রস্তাবিত সাবস্টেশনের খরচ প্রায় নয় গুণ। বিষয়টি নিয়ে কলেজের শিক্ষক, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা এবং সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন এসিগুলো চালানোর জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর ৩ হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি নতুন সাবস্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব করেছে। এ সাবস্টেশনের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার ৭৪১ টাকা। অথচ কলেজে এরই মধ্যে ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি সাবস্টেশন চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০০ কিলোওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করলেই গ্যালারিগুলোর নতুন এসির প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে।

এ কারণে ৩ হাজার কিলোওয়াটের বিশাল সক্ষমতার নতুন সাবস্টেশন কেন প্রয়োজন হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০০ কিলোওয়াট সক্ষমতা যোগ করা হলে প্রয়োজনীয় লোড সামলানো সম্ভব ছিল। তাঁর মতে, নতুন সাবস্টেশনের মতো বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবহার, ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং লোড বণ্টনের বিস্তারিত কারিগরি হিসাব করা প্রয়োজন।

শুধু ব্যয়ের তুলনাই নয়, প্রস্তাবিত সাবস্টেশনের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নতুন এসিগুলোর জন্য যেখানে ৫০০ কিলোওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে ৩ হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশন প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সক্ষমতার তুলনায় প্রস্তাবিত ক্ষমতা কয়েক গুণ বেশি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ভবিষ্যতে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও সেই ভবিষ্যৎ চাহিদার বাস্তব ও কারিগরি হিসাব স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

শজিমেকের শিক্ষক মহলেও বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য স্থাপিত গ্যালারিতে এসি চালু করতে এত বড় ব্যয়ের অবকাঠামো কেন প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে এসি স্থাপনে ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ের পর সেটি চালু করতে প্রায় ৭ কোটি টাকার কাছাকাছি আরেকটি অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে।

তবে বিষয়টির সঙ্গে শুধু এসি ও সাবস্টেশনের ব্যয়ের অসামঞ্জস্যই নয়, মেডিকেল কলেজের আরেকটি নির্মাণ প্রকল্পে জেনারেটর সরবরাহের অভিযোগও সামনে এসেছে। শজিমেকের অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল নির্মাণ প্রকল্পে নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে কম ক্ষমতার জেনারেটর সরবরাহের অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ই-জিপি দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সেখানে ২৫০ কেভিএ ক্ষমতার জেনারেটর সরবরাহের কথা ছিল। এ জন্য বরাদ্দ ছিল ৯ লাখ টাকা।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পে সরবরাহ করা হয়েছে ১২০ কেভিএ ক্ষমতার একটি জেনারেটর। অর্থাৎ চুক্তিতে নির্ধারিত ক্ষমতার তুলনায় সরবরাহ করা জেনারেটরের ক্ষমতা ১৩০ কেভিএ কম। এতে শুধু নির্ধারিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন পূরণ না হওয়ার প্রশ্নই নয়, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

জেনারেটরের উৎপাদনকারী দেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। দরপত্রের শর্তে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের তৈরি জেনারেটরের কথা উল্লেখ ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে চীনে তৈরি জেনারেটর সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন ও উৎপাদনকারী দেশের শর্ত মানা হয়েছিল কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুরু হওয়া মাল্টিপারপাস হলের নির্মাণকাজ শেষ হলেও এসব অভিযোগের কারণে ভবনটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি বলে জানা গেছে। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও সেটি ব্যবহার উপযোগী হিসেবে হস্তান্তর না হওয়া সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে একটি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য অডিটোরিয়াম বা বহুমুখী হলের প্রয়োজন থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ভবনটি অব্যবহৃত থাকা বাস্তব ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জেনারেটর সরবরাহের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কম ক্ষমতার জেনারেটর কেন সরবরাহ করা হয়েছিল এবং দরপত্রের শর্তের সঙ্গে ভিন্নতা কেন তৈরি হলো, সে বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে নতুন সাবস্টেশন প্রস্তাবের বিষয়টি নিয়ে শজিমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াদুদুল হক তরফদার গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। গত ১৫ জুলাই পাঠানো চিঠিতে তিনি বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন বলে জানা গেছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, নতুন সাবস্টেশনের এস্টিমেট অনুমোদনের জন্য পাঠানোর সময় তাঁর মতামত নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবে স্বাক্ষর করার জন্য তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

অধ্যক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কারিগরি বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগকে যাচাই করতে হয়। কোনো কারিগরি অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে বলেও তিনি মত দিয়েছেন। তাঁর এমন অবস্থানের পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র ও কারিগরি হিসাব যাচাইয়ের দাবি জোরালো হয়েছে।

গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুন হক জানিয়েছেন, তিনি মাত্র তিন মাস আগে বগুড়ায় যোগ দিয়েছেন। এসি স্থাপন, জেনারেটর সরবরাহ কিংবা সাবস্টেশনের প্রাক্কলন তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার আগের কর্মকর্তারা করেছেন। এ কারণে ওই সময়কার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে হয়তো সাবস্টেশনের পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদার কথা বিবেচনা করে কোনো প্রকল্পের সক্ষমতা নির্ধারণ করা হলে তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারিগরি হিসাব থাকা প্রয়োজন। বর্তমান চাহিদা, সম্ভাব্য সম্প্রসারণ, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের ভবিষ্যৎ অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাব্য বৃদ্ধি—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের সক্ষমতা নির্ধারণ করা হলে তা যাচাই করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ কারিগরি মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছেন।

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) বগুড়া জেলা সম্পাদক কেজিএম ফারুকও বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ৭৩ লাখ টাকার এসি চালাতে প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকার সাবস্টেশন প্রস্তাব এবং নির্ধারিত শর্তের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ জেনারেটর সরবরাহের অভিযোগ—দুই বিষয়ই কারিগরি কমিটির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

সরকারি উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, কারিগরি যৌক্তিকতা এবং দরপত্রের শর্ত মেনে কাজ সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জনসেবার বিষয় সরাসরি জড়িত। ফলে কোনো প্রকল্পের ব্যয় বা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

শজিমেকের ক্ষেত্রে এখন মূলত দুটি পৃথক অভিযোগ সামনে রয়েছে—নতুন এসি চালুর জন্য প্রস্তাবিত সাবস্টেশনের সক্ষমতা ও ব্যয় এবং মাল্টিপারপাস হলের জেনারেটর সরবরাহে দরপত্রের শর্ত মানা হয়েছে কি না। দুটি বিষয়েই সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদিত প্রাক্কলন, বিদ্যুৎ চাহিদার হিসাব, সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির কারিগরি বৈশিষ্ট্য এবং দরপত্রের শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। তবে সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে এ ধরনের প্রশ্ন ওঠার পর স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। এতে একদিকে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের সরকারি প্রকল্পে পরিকল্পনা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সবশেষে, ২৪টি এসি সচল করতে ৩ হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশন প্রয়োজন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর একটি নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়নেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পাওয়া সম্ভব। একইভাবে ২৫০ কেভিএর পরিবর্তে ১২০ কেভিএ জেনারেটর সরবরাহ এবং উৎপাদনকারী দেশের শর্তের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট নথি ও যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করেই নিশ্চিত করা যেতে পারে। তাই অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত