মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে জামায়াতের অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩২ বার
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে জামায়াতের অভিযোগ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আবারও সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে ঘিরে সিন্ডিকেটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, শুধু মালয়েশিয়া নয়, বিভিন্ন বৈদেশিক শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব ছিল এসব অনিয়ম বন্ধ করে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; কিন্তু তার পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ওই সেমিনারে বক্তারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সাম্প্রতিক প্রক্রিয়া, অভিবাসন ব্যয়, অতীতের অনিয়ম এবং ভবিষ্যতে কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

শফিকুর রহমান বলেন, মালয়েশিয়াসহ সব বৈদেশিক শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি কর্মীরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। এসব সমস্যার সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি জটিল অভিজ্ঞতা। ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়া বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী পাঠানোর সুযোগ বন্ধ ছিল। এর আগে ২০২২ সালের ব্যবস্থায় সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ওই ব্যবস্থাকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় পুরোনো বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।

গত আগস্টে মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এফডব্লিউসিএমএসে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়। তালিকাটি প্রকাশের পর থেকেই এজেন্সি নির্বাচন কীভাবে হয়েছে, নিয়োগের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্য বৈধ এজেন্সিগুলোর ভূমিকা কী থাকবে—এসব প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন অভিবাসনসংশ্লিষ্ট সংগঠনও সীমিত এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমবাজার পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

তবে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ কেবল ওই ২৫টি এজেন্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি প্রক্রিয়াটিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে; এর মধ্যে ২৫টি এজেন্সি মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সরাসরি নির্বাচিত এবং অন্য এজেন্সিগুলো সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বা বোয়েসেলও প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছিল।

ফলে শফিকুর রহমানের ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগের পাশাপাশি বাস্তবে প্রস্তাবিত নিয়োগ কাঠামো কতটা উন্মুক্ত, স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক হবে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ মালয়েশিয়ার মতো বড় শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় এজেন্সির সংখ্যা, তাদের নির্বাচন পদ্ধতি, চাকরির চাহিদা বণ্টন, নিয়োগ ব্যয় এবং কর্মীদের কাছ থেকে আদায়যোগ্য অর্থের সীমা—প্রতিটি বিষয় সরাসরি প্রভাব ফেলে বিদেশগামী শ্রমিকদের ওপর।

সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির অতীতের মালয়েশিয়া শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। তিনি কয়েকজন ব্যক্তি ও সাবেক জনপ্রতিনিধির নাম উল্লেখ করে ওই ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সেমিনারে উপস্থাপিত হয়নি। তাই এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মূল প্রবন্ধে আরও দাবি করা হয়, নতুন ২৫টি লাইসেন্সের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা রয়েছে এবং এর প্রভাবে একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার খরচ সাত থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এবং সম্ভাব্য অভিবাসন ব্যয়ের বিষয়টি তদন্ত বা বিচারিকভাবে চূড়ান্ত প্রমাণিত তথ্য হিসেবে নয়, সেমিনারে উপস্থাপিত অভিযোগ হিসেবে এসেছে।

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর আগের প্রক্রিয়া নিয়ে শ্রমিকদের ভোগান্তির ঘটনাও সেমিনারে আলোচনায় আসে। বক্তারা জানান, ২০২২ সালে একজন কর্মীর জন্য সরকারি পর্যায়ে নির্ধারিত ব্যয় ছিল প্রায় ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু বিভিন্ন অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক শ্রমিককে এর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ দিতে হয়েছে। গড়ে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগের কথাও তুলে ধরা হয়। ওই সময়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও ১৭ হাজারের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি বলে সেমিনারে দাবি করা হয়।

এই অভিজ্ঞতা বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক পরিবার জমি বিক্রি, ঋণ গ্রহণ কিংবা সঞ্চয় ভেঙে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করে। একটি কর্মসংস্থানের আশায় পরিবারগুলো যখন কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে, তখন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সামান্য অনিয়মও তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে। এ কারণে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ব্যয়ের সীমা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি হাজারো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সরকারি কর্তৃপক্ষও সম্ভাব্য কর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া পুরোপুরি নির্ধারিত হওয়ার আগে কোনো ধরনের অর্থ প্রদান, মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া ছাড়া দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে টাকা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সেমিনারে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। এতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ এবং নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনসহ দলটির অন্য নেতারা বক্তব্য দেন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করেন। মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। তাই নতুন করে শ্রমবাজার চালু হওয়ার সুযোগ যেমন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি আগের অভিজ্ঞতার কারণে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজনও তৈরি হয়েছে।

শফিকুর রহমানের অভিযোগ এবং সেমিনারে উত্থাপিত বিভিন্ন বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—বিদেশে যাওয়ার সুযোগ যেন সীমিত কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধার উৎসে পরিণত না হয়। অন্যদিকে সরকারের ঘোষিত কাঠামোয় অধিকসংখ্যক এজেন্সিকে যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মী বাছাই থেকে শুরু করে চাকরির চাহিদা, ভিসা, অভিবাসন ব্যয় এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর শ্রমিকের অধিকার—প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অতীতের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সাফল্য শুধু কতজন কর্মী পাঠানো হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। কর্মীরা কত কম খরচে, নিরাপদ ও বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যেতে পারলেন এবং সেখানে গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ ও পারিশ্রমিক পেলেন কি না—সেটিই হবে বড় মাপকাঠি। তাই নতুন ব্যবস্থায় সরকারি নজরদারি, জবাবদিহি এবং শ্রমিকস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত