বাটেক্সপোতে জাতীয় ঐকমত্য চান গোলাম পরওয়ার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৭ বার
বাটেক্সপোতে জাতীয় ঐকমত্য চান গোলাম পরওয়ার

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ এক যুগের বিরতির পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন বাটেক্সপো ফিরছে। আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বাটেক্সপো ২০২৬। আন্তর্জাতিক ক্রেতা, পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা, শ্রমিক, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে ঘিরে আয়োজিত এই প্রদর্শনীকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

এই আয়োজনের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐতিহ্য নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বাটেক্সপোর মতো জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে দীর্ঘদিনের ঐকমত্য ও অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে মূলত পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, জাতীয় স্বার্থ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে শিল্পের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বাটেক্সপোর যাত্রা শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এটি দেশের পোশাকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। এক যুগের বেশি সময় পর এ আয়োজনের প্রত্যাবর্তনকে তিনি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবারের বাটেক্সপোতে শিল্পের পরিবর্তন, উদ্ভাবন, টেকসই উৎপাদন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক অবস্থান তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে বাটেক্সপোর উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ধরন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন জামায়াতের এই নেতা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে বাটেক্সপোর উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে থাকার বার্তা দেওয়া হতো। এবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি মনে করেন, অতীতের অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারাটি বজায় থাকলে জাতীয় ঐকমত্যের একটি শক্তিশালী বার্তা পাওয়া যেত।

বিজিএমইএর পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীকে বাটেক্সপো ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতিকেও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে এবারের আয়োজনের উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকছে।

গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সঙ্গে দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির সম্পর্ক। তিনি মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি দেশের রপ্তানি পণ্য শুধু বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিদেশে যায় না; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের সক্ষমতা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, উৎপাদনব্যবস্থা এবং সামগ্রিক পরিচিতির একটি ধারণাও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছায়। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্বের কারণে বাটেক্সপোর মতো আয়োজনকে তিনি শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগের সুযোগ হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতা ও অংশীদারদের সামনে বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। তাই আয়োজনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি ও তথ্যের দ্রুত বিস্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কোনো দেশের ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক বার্তা খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পোশাক খাতের মতো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত শিল্পে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি স্থিতিশীলতা, কর্মপরিবেশ, টেকসই উৎপাদন এবং ব্যবসায়িক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিজিএমইএর এবারের পরিকল্পনাতেও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, বাটেক্সপো ২০২৬-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের সক্ষমতা, উদ্ভাবন, টেকসই উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা হবে। আয়োজনকে ঘিরে বৈশ্বিক ক্রেতা, শিল্পনেতা, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য অংশীজনকে ঢাকায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাটেক্সপোর প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণেরও নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, নতুন ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদার আকর্ষণে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটি জাপানের বাজারে প্রবেশ বাড়াতে একটি পৃথক ডেস্ক চালুর পরিকল্পনাও করেছে এবং হংকংয়ে রোডশোর আয়োজনের কথা জানিয়েছে।

গোলাম পরওয়ার অবশ্য তার বক্তব্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার উদ্দেশ্য নেই বলে জানিয়েছেন। বরং বিজিএমইএকে একটি জাতীয় শিল্প সংগঠন হিসেবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, পেশাদার ও দূরদর্শী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্যে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সরকারের সম্পদ হিসেবে না দেখে শ্রমিক, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

দেশের পোশাকশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সরবরাহকারী, পরিবহনকর্মী, বন্দর ও লজিস্টিকস খাতের কর্মী এবং রপ্তানিকারক—বিস্তৃত একটি অর্থনৈতিক চেইন এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা শুধু ব্যবসায়ীদের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে।

এ কারণে বাটেক্সপোর মতো আয়োজনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক গুরুত্বও সামনে এসেছে। একদিকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, অন্যদিকে শিল্প সংগঠনটির দৃষ্টিতে আয়োজনটি বাংলাদেশের পোশাক খাতকে নতুনভাবে বিশ্ববাজারে তুলে ধরার সুযোগ। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারসাম্য রেখে বাটেক্সপোকে সফল করার বিষয়টিই এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গোলাম পরওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে বিজিএমইএ জাতীয় শিল্পের আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোতে আরও পেশাদারিত্ব, যোগ্যতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেবে। তার আহ্বানের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরে গিয়ে পোশাকশিল্পের স্বার্থ, জাতীয় ঐকমত্য এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা।

দীর্ঘ বিরতির পর বাটেক্সপোর প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি প্রদর্শনীর আয়োজন নয়; বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পরিবর্তিত বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার এই সময়ে বাংলাদেশ কীভাবে তার উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি, টেকসই শিল্পব্যবস্থা এবং নতুন বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরে—তার ওপরও এবারের আয়োজনের গুরুত্ব অনেকাংশে নির্ভর করবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা জাতীয় শিল্পের আয়োজনে অন্তর্ভুক্তি ও ঐকমত্যের প্রশ্নটিকেও সামনে এনেছে।

শেষ পর্যন্ত বাটেক্সপো কতটা সফলভাবে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সক্ষমতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারে, সেটিই হবে আয়োজনটির অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। আর গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য সেই আয়োজনের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য ও অন্তর্ভুক্তির একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছে। এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত বা ভিন্নমত থাকার বাইরে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং দেশের লাখো শ্রমিক ও উদ্যোক্তার স্বার্থকে সামনে রেখে একটি সফল আন্তর্জাতিক আয়োজন নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত