ক্রসফায়ার ও মামলা নিয়ে আইনমন্ত্রীর গুরুতর অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৬ বার
ক্রসফায়ার ও মামলা নিয়ে আইনমন্ত্রীর গুরুতর অভিযোগ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্রসফায়ারের নামে সাড়ে চার হাজার মানুষকে হত্যা এবং ৬০ লাখের বেশি বিএনপি নেতাকর্মীর নামে গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে জুলাই-আগস্টের ২০ দিনে ১ হাজার ৪০০ মানুষ হত্যার অভিযোগও তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব ঘটনার পরও আওয়ামী লীগের কোনো অনুতাপ নেই।

বৃহস্পতিবার ঢাকার আইনজীবী সমিতি আয়োজিত জন্মাষ্টমী উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, রাজনৈতিক মামলার সংস্কৃতি এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা, গুম এবং ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটে একটি জেলা আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়নবিষয়ক সভাতেও তিনি সাড়ে চার হাজারের বেশি বিএনপি নেতাকর্মীকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা এবং সাত শতাধিক নেতাকর্মীকে গুমের অভিযোগ করেছিলেন।

৬০ লাখের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা করা হয়েছিল বলেও আইনমন্ত্রী দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব মামলার ৯৯ শতাংশের বাদী ছিল পুলিশ। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার সংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে। তবে এই সংখ্যাগুলো আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে করা দাবি হিসেবে এসেছে; স্বাধীনভাবে যাচাই করা সরকারি পরিসংখ্যান বা পূর্ণাঙ্গ মামলার হিসাবের সঙ্গে এর মিল রয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।

বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও রাজনৈতিক পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘটনার পৃথক তদন্ত, নিহত ব্যক্তির পরিচয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো সামগ্রিক সংখ্যা বা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

আইনজীবী সমিতির অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পেশাগত পরিচয়ের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, আদালতের সামনে দাঁড়ানোর সময় একজন আইনজীবীর প্রধান পরিচয় তার পেশাগত পরিচয়। অনুষ্ঠানে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আইনজীবীদের উপস্থিতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতে দাঁড়ালে তাদের পরিচয় একজন আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তার বক্তব্যে আইনের শাসন ও পেশাগত নিরপেক্ষতার বিষয়টিও উঠে আসে। আইনজীবী সমাজের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি এমন একটি বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন, যেখানে ব্যক্তির ধর্ম, রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তে আইন ও ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ রফিকুল ইসলাম, মহানগর দায়রা জজ শাহজাহান কবির এবং ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

একই দিনে রাজধানীর একটি হোটেলে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে আয়োজিত জাতীয় পরামর্শ সভাতেও বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী। আইন মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর ইউএনওডিসি যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

সেখানে তিনি মানব পাচার ও অনলাইনভিত্তিক অপরাধ মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়া, অনলাইনের মাধ্যমে সংঘটিত পাচার এবং অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

মানব পাচার প্রতিরোধে আইন সংস্কারের কথাও উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় বিভিন্ন আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। মানব পাচারের সংজ্ঞাকে আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে অপরাধের বিস্তৃত ধরনগুলো আইনি কাঠামোর আওতায় আনা যায়।

মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বর্তমানে শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। সীমান্ত, অনলাইন যোগাযোগ, অবৈধ অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে এ ধরনের অপরাধের যোগসূত্র থাকায় বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন সময় বিদেশে যাওয়ার আশায় প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে মানব পাচার প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সচেতনতা এবং নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মাদক অপরাধ মোকাবিলার বিষয়টিও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। তিনি জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং সংশোধিত আইন মাদকসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করেন।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানব পাচার ও অনলাইন অপরাধ দমনের বিষয়টি একই আলোচনায় এসেছে। এর মাধ্যমে অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আইন ও বিচারব্যবস্থাকেও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

জাতীয় পরামর্শ সভায় আইন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, ইউএনওডিসি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আইন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদেম উল কায়েসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ইউএনওডিসির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিস্টিয়ান হোলগেও বক্তব্য দেন।

আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে দুটি বিষয় পাশাপাশি উঠে এসেছে। একদিকে তিনি অতীতের সরকারের সময়কার কথিত রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম, ক্রসফায়ার এবং মামলার অভিযোগ তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে বর্তমান সময়ে আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে মানব পাচার, মাদক, অনলাইন জুয়া ও অন্যান্য অপরাধ মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সত্য উদঘাটনের জন্য স্বচ্ছ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানিমূলক মামলা হয়ে থাকলে তারও আইনগত পর্যালোচনা প্রয়োজন। তবে অভিযোগ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি প্রত্যেক ঘটনায় প্রমাণভিত্তিক তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে বিচারিক নিষ্পত্তিই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামনে এখন একই সঙ্গে পুরোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি, নতুন অপরাধ মোকাবিলা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতীতের অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায় নির্ধারণ যেমন প্রমাণভিত্তিক বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়, তেমনি ভবিষ্যতে যাতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য কোনো নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে প্রভাবিত না করে, সেটিও রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে মানব পাচার, মাদক ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়টিও সামনে থাকছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত