প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে ‘ভূমি দৃষ্টি অ্যাপ’-এ জিও ফেন্সিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। নির্ধারিত কর্মস্থলের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থান করলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হাজিরা দিতে পারবেন। এর ফলে কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করে হাজিরা দেওয়ার সুযোগ কমবে এবং মাঠপর্যায়ের ভূমিসেবা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়বে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার ভূমি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘ভূমি দৃষ্টি অ্যাপ’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকদের ভূমিসেবা কার্যক্রমে আরও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর এই মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থার পাইলটিং ইতোমধ্যে দেশের ছয়টি জেলায় শুরু হয়েছে। জেলাগুলো হলো ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম। পাইলট প্রকল্পের আওতায় এসব জেলার ৬১০টি কার্যালয়ের ৯১৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থিতি ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। পাইলটিং থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও ফলাফল পর্যালোচনার পর পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে জিও ফেন্সিং প্রযুক্তি। সহজভাবে বললে, কোনো নির্দিষ্ট স্থানের চারপাশে প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি ভার্চ্যুয়াল ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ভূমি অফিসগুলোর ক্ষেত্রেও একইভাবে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের সীমানা তৈরি করা হবে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মোবাইল ফোনের অবস্থান যখন সেই নির্ধারিত সীমানার ভেতরে থাকবে, তখনই ‘ভূমি দৃষ্টি অ্যাপ’-এ হাজিরা নিবন্ধনের সুযোগ সক্রিয় হবে।
এর ফলে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী অফিসে না গিয়ে দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে হাজিরা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা আগের তুলনায় সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ কেবল হাজিরা দেওয়াই নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত কর্মস্থলে অবস্থান করছেন কি না, সেটিও প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করা যাবে। মাঠপর্যায়ের কার্যালয়ে নিয়মিত সরেজমিন তদারকির সীমাবদ্ধতার মধ্যে এমন ব্যবস্থা প্রশাসনিক নজরদারিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
‘ভূমি দৃষ্টি অ্যাপ’-এর মাধ্যমে কর্মদিবসের শুরুতে নির্ধারিত কর্মস্থলে পৌঁছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেক-ইন করতে পারবেন। কর্মদিবস শেষে অফিস ত্যাগের সময় চেক-আউট করার ব্যবস্থাও থাকবে। একই অ্যাপের মাধ্যমে ছুটির আবেদন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে উপস্থিতি, কর্মস্থলে অবস্থান এবং ছুটিসংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক কার্যক্রম একই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে।
তবে সরকারি দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে অফিসের বাইরে যেতে হলে সেটিকে অনুপস্থিতি হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভূমি প্রতিমন্ত্রী জানান, অফিস চলাকালীন কোনো কর্মকর্তা কর্মস্থল ত্যাগ করলে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল সংকেত দেখা যাবে। কিন্তু সভা, তদন্ত, পরিদর্শন কিংবা অন্য কোনো সরকারি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ‘সাইট ভিজিট’ অপশন ব্যবহার করে বের হওয়ার কারণ উল্লেখ করতে পারবেন।
এ ধরনের ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তাদের কাজের বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। কারণ ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু অফিসকেন্দ্রিক নয়। জমি পরিদর্শন, তদন্ত, বিরোধসংক্রান্ত কার্যক্রম, বিভিন্ন সরকারি সভা কিংবা সরেজমিনে তথ্য যাচাইয়ের জন্য কর্মকর্তাদের অনেক সময় কার্যালয়ের বাইরে যেতে হয়। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থিতি ব্যবস্থায় অফিসের বাইরে সরকারি দায়িত্ব পালন এবং ব্যক্তিগত কারণে কর্মস্থল ত্যাগের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভূমি অফিস দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সেবাকেন্দ্র। নামজারি, জমির রেকর্ড, খাজনা, ভূমি উন্নয়ন করসহ নানা ধরনের সেবার জন্য প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব কার্যালয়ের ওপর নির্ভর করেন। জমিজমা সংক্রান্ত অনেক কাজের সঙ্গে মানুষের সম্পদ, পারিবারিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের বিষয় জড়িত থাকে। ফলে সেবাদাতা কর্মকর্তাদের নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পাওয়া এবং নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই বাস্তবতার কথা তুলে ধরে ভূমি প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাধারণত ভূমি অফিসে নাগরিকেরা সরাসরি উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের ভূমিসেবা গ্রহণ করেন। তাই সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। কর্মকর্তাদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা গেলে নাগরিকদের সেবা পেতে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা বা ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ভূমি প্রশাসনের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা কার্যালয়গুলো নিয়মিত সরেজমিনে তদারক করা। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ভূমি কার্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিটি অফিসে নিয়মিত গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই করা সময়সাপেক্ষ। জনবল ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে সব কার্যালয়ে একই মাত্রায় সরেজমিন তদারকি করাও কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে অবস্থানভিত্তিক অনলাইন যাচাই ব্যবস্থা তদারকি প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে। কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মকর্তাদের উপস্থিতির তথ্য দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। একই সঙ্গে কোনো কার্যালয়ে নিয়মিত অনুপস্থিতি বা কর্মস্থলে অবস্থানসংক্রান্ত সমস্যা থাকলে তা তথ্যের ভিত্তিতে শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
মন্ত্রণালয় মনে করছে, দেশের সব ভূমি কার্যালয়কে একই ডিজিটাল মনিটরিং কাঠামোর আওতায় আনা গেলে উপস্থিতি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও বাড়ানো সম্ভব হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক তদারকির সুযোগ তৈরি হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের বাস্তব সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা এবং মাঠপর্যায়ে এর যথাযথ প্রয়োগের ওপর। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার ইন্টারনেট সংযোগ, মোবাইল ডিভাইসের সক্ষমতা, অবস্থান শনাক্তকরণের নির্ভুলতা এবং সরকারি কাজে অফিসের বাইরে থাকা কর্মকর্তাদের তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাইলটিং শেষে এসব বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেই সারাদেশে ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভূমি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে ভূমিসেবা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তথ্যভিত্তিক তদারকি শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং মাঠপর্যায়ের ভূমিসেবা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা জোরদার করার প্রত্যাশা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ। এ সময় মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় থাকা ছয় জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনলাইনে অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।
ভূমি অফিসে জিও ফেন্সিংভিত্তিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালুর ফলে এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা সফলভাবে কাজে লাগিয়ে এটি সারাদেশে কার্যকর করা গেলে মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসনে ডিজিটাল নজরদারি আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির একটি নতুন কাঠামো তৈরি হতে পারে।