প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় জমি নিয়ে বিরোধের তদন্ত চলাকালে ভূমি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এক যুবককে থাপ্পড় মারার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে ফতুল্লার রঘুনাথপুর এলাকায়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি ইকবাল হোসেন। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হত্যার পর লাশ গুমের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন জমির মালিকানা দাবি করা এক পরিবারের সদস্যরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইকবাল হোসেন।
ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার দুপুরে। ওই দিন রঘুনাথপুর এলাকায় বিরোধপূর্ণ জমি সরেজমিনে তদন্ত করতে যান ফতুল্লা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিল্টন রায়। জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কাগজপত্র যাচাই ও বাস্তব পরিস্থিতি দেখার জন্য এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
জমির মালিক দাবি করা কাশেম মোল্লার স্ত্রী কহিনুর আক্তার এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় ইকবাল হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁর স্বামী ক্রয়সূত্রে ওই জমির মালিক। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা জমিটি ভোগদখল করে আসছেন এবং নিয়মিত খাজনা, বিদ্যুৎ বিলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খরচ পরিশোধ করেছেন।
পরিবারটির দাবি, জমিটিতে আগে একটি টিনশেড ঘর ছিল। ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় প্রায় এক বছর আগে সেটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর জমিটি টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। কিন্তু পরে ইকবাল হোসেন ওই জমির ওপর মালিকানা দাবি করে সেখানে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন বলে অভিযোগ করেন কহিনুর।
জমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিসও হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কহিনুরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের পরও বিরোধের সমাধান হয়নি। বরং রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব ব্যবহার করে তাঁদের নির্মাণকাজ বন্ধ করে জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পরবর্তীতে জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা করা হয়। অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, ওই মামলার পর আদালত উভয় পক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এ অবস্থায় জমিটির প্রকৃত অবস্থা ও উভয় পক্ষের দাবি যাচাই করতে বুধবার সরেজমিন তদন্তের আয়োজন করা হয়।
কহিনুর আক্তারের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত দিনে তিনি তাঁর স্বামী কাশেম মোল্লার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিল্টন রায় তদন্ত করছিলেন। এ সময় ইকবাল হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে কাশেম মোল্লার ওপর হামলা করা হয়। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে কহিনুর আক্তারও মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারটির আরও অভিযোগ, ঘটনাস্থলে চিৎকার ও উত্তেজনা তৈরি হলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। তখন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পরে স্থানীয় লোকজন আহত কাশেম মোল্লাকে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে অবস্থিত ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একটি ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে কাশেম মোল্লার ভাতিজা সিয়ামকে থাপ্পড় মারা হচ্ছে। ভিডিও ধারণের সময় সিয়ামের হাতে মুঠোফোন ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি ভিডিও করছিলেন। সেই সময়ই তাঁকে থাপ্পড় মারা হয়।
ঘটনাটি সম্পর্কে ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি পরিস্থিতি থামানোর চেষ্টা করেছেন বলেও জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জমি নিয়ে বিরোধের দুই পক্ষকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। উভয় পক্ষের নথিপত্র পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন থানার উপপরিদর্শক শামসুল হক সরদার। তিনি জানিয়েছেন, অভিযোগটি তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে জমি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি তদন্ত চলাকালে সংঘটিত কথিত হামলার ঘটনাটিও এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের আওতায় এসেছে।
অন্যদিকে ইকবাল হোসেন জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জমিটি অন্য পক্ষই দখলে রেখেছিল। ভিডিও ধারণের কারণেই ওই যুবককে তিনি থাপ্পড় দিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবে জমি নিয়ে বিরোধের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ভিন্ন।
ইকবাল হোসেনকে ঘিরে অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বছরের ৪ জুন সিদ্ধিরগঞ্জে এক ব্যবসায়ীর জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন চৌরাঙ্গি গ্রুপের স্বত্বাধিকারী কাজী আব্দুস সাত্তার। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী আসিয়ান পরিবহনের একটি বাস ভাঙচুরের অভিযোগও ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠে। ওই সময় বাসচালকের সঙ্গে তাঁর তর্কের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল।
আরও আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক মিনহাজ আমানকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগে বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা যায়। ১২ ডিসেম্বর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে ইকবাল হোসেনকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে জাতীয় নির্বাচনের সময় ওই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান ঘটনায় মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্য জমিটির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের দাবি। এক পক্ষ জমিটি ক্রয়সূত্রে নিজেদের মালিকানাধীন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকার কথা বলছে। অন্যদিকে ইকবাল হোসেন জমিটি অন্য পক্ষের দখলে থাকার দাবি করছেন। ফলে জমিটির মালিকানা, দখল এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলো নথিপত্র ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে কোনো পক্ষের ওপর হামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সত্য কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে ঘটনাস্থলে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি জনসমক্ষে এসেছে। ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ যাচাই করে আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জমি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ে নানা জটিলতার সৃষ্টি করে থাকে। এসব বিরোধ কখনো সালিস, কখনো প্রশাসনিক তদন্ত এবং কখনো আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির দিকে যায়। কিন্তু বিরোধের সময় সংঘাত বা ভয়ভীতির ঘটনা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর নিরাপত্তার পাশাপাশি সরকারি তদন্ত কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের রঘুনাথপুরের ঘটনাতেও এখন নজর রয়েছে তদন্তের দিকে। জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের দাবির পাশাপাশি হামলা, থাপ্পড় এবং হুমকির অভিযোগ কতটা সত্য, তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ভূমি কার্যালয়ের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।