পারিবারিক সহিংসতায় নারীর নিরাপত্তা সংকট, ফাহমিদা হত্যাকাণ্ড ও সাম্প্রতিক ঘটনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৪ বার

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ফাহমিদা তাহসিন (কেয়া)-র হত্যাকাণ্ড দেশের পারিবারিক সহিংসতার একটি শোকজনক চিত্র সামনে এনেছে। প্রায় এক যুগের সংসারে চার সন্তানের জন্ম দেওয়া ফাহমিদাকে, পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন স্বামী সিফাত আলী। ঘটনার পর তিনি মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন এবং লাশ হাসপাতাল রেখে পালিয়ে যান। এই ঘটনায় ফাহমিদার মা নাজমা বেগম মিরপুর মডেল থানায় সিফাতসহ ১০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ৩২২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২০৮ জন নারী ও শিশু। আসকের রিপোর্টে দেখা গেছে, স্বামীর হাতে সবচেয়ে বেশি নারী নিহত হয়েছেন—সংখ্যা ১৩৩ জন। এছাড়া স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন ৪২ জন, এবং অন্য পরিবারের সদস্যদের হাতে ৩৩ জন।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জাতীয় নারী সুরক্ষা হেল্পলাইন ‘১০৯’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সহায়তা চেয়ে ৪৮ হাজার ৭৪৫টি কল এসেছে, যেখানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়েছে নারী প্রার্থীরা। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে নারী নির্যাতনের ঘটনায় ১৭ হাজার ৩৪১টি কল এসেছে, যার মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ ৯ হাজার ৭৪৬টি, এবং স্বামীর বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৩৯৪টি অভিযোগ রয়েছে।

ফাহমিদার পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মধ্যরাতে রান্না চলাকালীন সময়ে স্বামী সিফাতের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। এরপর তাঁকে মারধর করা হয়, ঘরের কক্ষে আটকে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারকে জানানো হয় যে সে অসুস্থ। পরে হাসপাতাল পৌঁছালে দেখা যায়, ফাহমিদা মৃত্যুবরণ করেছেন। তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা সন্দিহান যে, এটি কোনো আত্মহত্যা নয়।

ফাহমিদার ফুফা মো. শামসুদ্দোহা খান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তিনি ও পরিবারের সদস্যরা বাসায় ঢুকে দেখেন রান্নাঘরে রান্নার আয়োজন চলছিল। হাঁড়িতে মাংস ও মসলাপাতি রাখা ছিল, যা নির্দেশ করে যে ফাহমিদা নিজ উদ্যোগে আত্মহত্যা করতে পারেননি। পরিবারের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত মূল আসামিক সিফাতসহ কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ রোমন জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত অনেকদূর এগিয়েছে এবং প্রধান আসামিক গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ফাহমিদার ঘটনার পাশাপাশি দেশে নারী নির্যাতনের আরও কয়েকটি শঙ্কাজনক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। ১৮ জুন সিলেটে সাবিনা বেগমকে হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগে স্বামী গ্রেপ্তার হন। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ইয়াছিন আলী নামের এক ব্যক্তি স্ত্রী, সন্তান ও স্ত্রীর বড় বোনকে হত্যা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। এ ধরনের ঘটনা পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা ও পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির দুঃসহ বাস্তবতা তুলে ধরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান প্রথম আলোকে বলেন, পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও মেয়েদের সামাজিক অবস্থান পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তিনি উল্লেখ করেন, নারীদের অবশ্যই নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত এবং আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী হলে শাস্তির আশঙ্কা দ্বারা নির্যাতন কমানো সম্ভব।

দেশের নারী ও শিশু সংরক্ষণের জন্য কার্যকর আইন, সতর্ক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সচেতন সমাজের প্রয়োজনীয়তা একবারের জন্যও অবহেলা করা যায় না। ফাহমিদা হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পারিবারিক সহিংসতার বিষয়ে সামাজিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে জাগরুকতা কতটা জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত