প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে মহেশখালী-মাতারবাড়ী অঞ্চলে নতুন শহরের জন্ম হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) নবগঠিত সদস্যদের সঙ্গে বৈঠককালে তিনি এ কথা বলেন।
বৈঠকে মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর একটি বিস্তারিত প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন মিডার চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুণ। তিনি জানান, এই মেগা প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপ ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০ থেকে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪৫ থেকে ২০৫৫ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) দেড়শ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “মহেশখালী-মাতারবাড়ী প্রকল্প শুধু একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমাদের লক্ষ্য হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্লু ইকোনমি গড়ে তোলা। এ অঞ্চলকে কেবল ফ্যাসিলিটেটিং জোন হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এখান থেকেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়বে। সমুদ্রই হবে বিশ্বের পথে আমাদের মহাসড়ক।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি এক নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ এ খাত নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মহেশখালীতে একটি বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ সুবিধা। বিশ্বের যেসব দেশ এ খাতে অগ্রসর, তাদের কাছ থেকে জ্ঞান ও সহযোগিতা নিতে হবে।”
ড. ইউনূস এ সময় ওশান ইকোনমি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন, গবেষণা কার্যক্রম বিস্তৃত করা এবং নতুন প্রজন্মকে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে একাডেমিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা সমুদ্র জগতে কখনো প্রবেশ করিনি। সেখানে আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভান্ডার তৈরি করতে হবে। এজন্য সমন্বিত গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।”
পরিবেশ সংরক্ষণকেও প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, মহেশখালী-মাতারবাড়ীর বনভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কী অবস্থায় আছে এবং ভবিষ্যতে আমরা সেটিকে কীভাবে দেখতে চাই তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনই তৈরি করা প্রয়োজন। বৈঠকে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক করার বিষয়েও আলোচনা হয়, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হবে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মিডার সদস্য কমোডর তানজিম ফারুক ও মো. সারোয়ার আলম, প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না।
মহেশখালী-মাতারবাড়ীকে ঘিরে সরকারের এই উদ্যোগ বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের এক নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও এগিয়ে নেবে।