জাতিসংঘে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: অবিলম্বে গাজা যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৮ বার
গাজায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান, শান্তির ঘোষণা ট্রাম্পের

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে গাজা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এদিন সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন চলমান গাজা যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করার। তিনি একে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমাদের এটা সম্পন্ন করতে হবে। আমাদের শান্তি আলোচনা করতে হবে। জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে হবে।’’ তার ভাষণ বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে ট্রাম্পের বক্তৃতা শুরু থেকেই ছিল সরব এবং আক্রমণাত্মক। তিনি টেলিপ্রম্পটার ও ভাঙা এসকেলেটরের দিকে ইঙ্গিত করে হালকা হাস্যরসের মধ্য দিয়ে বক্তব্য শুরু করলেও মূলত তার ভাষণে ছিল তীব্র সতর্কবার্তা। হামাসের হাতে বন্দি ইসরাইলিদের উদ্ধারের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে তিনি তুলে ধরেন। ট্রাম্প জানান, বর্তমানে ৪৮ জন বন্দির মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে, এবং তাদের মুক্ত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তার আহ্বান ছিল স্পষ্ট—যারা শান্তির পক্ষে, তাদের সবাইকে বন্দিদের মুক্তির দাবিতে একজোট হতে হবে।

ট্রাম্প-এর্দোগান বৈঠক: ২৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রশ্নে ট্রাম্প তার কড়া অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘‘এই সংস্থার কিছু সদস্য একতরফাভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে চাইছে। হামাস সন্ত্রাসীদের নৃশংসতার পুরস্কার অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।’’ ট্রাম্পের বক্তব্যে বোঝা যায়, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে একধরনের ভুল বার্তা হিসেবে দেখছেন, যা হামাসের মতো গোষ্ঠীকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। তার মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে সেটি হামাসের অতীত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার সামিল হবে।

এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কারণ, গত কয়েক মাসে যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরেও এই বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইল জোরালোভাবে এর বিরোধিতা করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতোই ইসরাইলের পক্ষেই অবস্থান ধরে রেখেছে।

ট্রাম্প তার ভাষণে দাবি করেন, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সাতটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছে। এ কারণেই তিনি মনে করেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার তার প্রাপ্য। যদিও এই দাবিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে, তথাপি ট্রাম্প তার পূর্ববর্তী প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগকে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

তার বক্তব্যের আগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভা ফিলিস্তিন প্রশ্নে ন্যায্য সমাধানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি বলেন, বিশ্বকে আর দ্বিমুখী মানদণ্ডে পরিচালনা করা যাবে না, ইসরাইলি আগ্রাসন থামাতে হবে এবং ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। লুলার বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্টতই ভিন্নমুখী, যা জাতিসংঘে উপস্থিত কূটনীতিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

গাজা যুদ্ধ আজ প্রায় দুই বছর ধরে চলমান। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামাসের আকস্মিক হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত এখনো থামেনি। ইসরাইলের পাল্টা সামরিক অভিযান গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক ভবন—সবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এ পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে এবং সহস্রাধিক বেসামরিক নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির আহ্বান আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিদিনই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু ইসরাইল এখনো ঘোষণা করেছে, হামাস সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তারা যুদ্ধ থামাবে না।

ট্রাম্প যদিও যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেছেন, তবে তিনি হামাসকে কোনোভাবেই বৈধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। বরং তার জোর ছিল জিম্মি মুক্তি ও ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি অনুসরণেরই অংশ, যেখানে ইসরাইল সর্বদাই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে সুরক্ষা পেয়েছে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং মার্কিন কূটনীতির ভবিষ্যৎ দিকও নির্ধারণ করবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে ফিলিস্তিন স্বীকৃতির বিরোধিতা অব্যাহত রাখে, তবে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বহু দেশ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান নেবে। এতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একধরনের বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এমনিতেই নানা মতবিরোধের জন্য পরিচিত। তবে এবারের অধিবেশন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্ন নতুন করে আন্তর্জাতিক এজেন্ডার শীর্ষে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এমন অবস্থান নিঃসন্দেহে ইসরাইলের জন্য কূটনৈতিক সান্ত্বনা। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় যারা প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে, তাদের জন্য তা কোনো আশার আলো নয়।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তার ভাষণে বহুবার উল্লেখ করেছেন যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই সন্ত্রাসবাদের প্রতি পুরস্কার প্রদান। তার এই ভাষণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রিপাবলিকান সমর্থক মহলে প্রশংসিত হলেও আন্তর্জাতিকভাবে তা সমালোচনার ঝড় তোলে। বিশেষ করে আরব ও মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো এ বক্তব্যকে একতরফা এবং পক্ষপাতদুষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছে।

ফিলিস্তিনের পক্ষের কূটনীতিকরা বলছেন, তাদের রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায্য অধিকারের ভিত্তিতেই হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে শুধু হতাশাজনক নয়, বরং শান্তির পথে অন্তরায় হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ছাড়া ফিলিস্তিনিদের জন্য স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

জাতিসংঘের এই অধিবেশনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি—দুটো ইস্যুই এখন বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ট্রাম্পের বক্তব্য হয়তো ইসরাইলের পাশে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে, তবে তা ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকার ও আন্তর্জাতিক সমর্থনকে একেবারেই থামাতে পারবে না। বরং এই বক্তব্যের ফলে বিশ্ব আরও বিভক্ত হবে, আর ফিলিস্তিন প্রশ্ন আরও তীব্র আকারে সামনে আসবে।

ফলত, প্রশ্ন রয়ে যায়—গাজা যুদ্ধ থামবে কবে? এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি কি হামাসের জন্য পুরস্কার নাকি দীর্ঘদিনের নিপীড়িত জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ধাপ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত