প্রকাশ: ২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ চার দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে ফিরছে মেসোপটেমিয়ার সিংহরা। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর ২০২৬ সালে এসে আবারও ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে ইরাক। দীর্ঘ এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। বাছাইপর্বের কঠোর ধাপ পেরিয়ে এবং আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়ার বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করেছে উত্তর আমেরিকার এই বিশ্ব আসরের টিকিট। নতুন এই যাত্রার মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে ইরাকের ফুটবল দল কেবল অংশগ্রহণ করতেই যাচ্ছে না, বরং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিতে প্রস্তুত তারা। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে সামনে রেখে ইরাকের প্রধান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড সম্প্রতি ২৬ সদস্যের এক ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী দল ঘোষণা করেছেন।
ইরাকের এই নতুন প্রজন্মের দলটিতে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তারুণ্যের দারুণ এক সংমিশ্রণ ঘটেছে। স্কোয়াডের দিকে তাকালে দেখা যায়, দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিযোগিতামূলক লিগে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে আসছেন। ইউরোপের নামিদামি ক্লাব থেকে শুরু করে মেজর লিগ সকারের মতো লিগে খেলা খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি ইরাকের খেলার ধরনে এক নতুন গতি ও বৈচিত্র্য এনে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। দলের রক্ষণভাগ ও মধ্যমাঠের শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি আক্রমণভাগে ধারালো আক্রমণের জন্য কোচ আর্নল্ড বাজি ধরেছেন সেইসব খেলোয়াড়দের ওপর, যারা চাপের মুখেও মাথা ঠান্ডা রেখে গোল করার ক্ষমতা রাখেন।
দলের আক্রমণের মূল ভরসা হিসেবে থাকছেন আয়মেন হুসেন, যিনি বাছাইপর্বে দলের হয়ে সর্বোচ্চ আটটি গোল করে নিজের জাত চিনিয়েছেন। তার কাঁধে থাকবে দলের গোল করার গুরুদায়িত্ব। পাশাপাশি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আলী আল-হামাদিকে ঘিরেও ইরাকি সমর্থকদের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। তার গতি এবং ক্ষিপ্রতা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকি হতে পারে। মধ্যমাঠে সৃজনশীলতার দায়িত্বে থাকবেন আমির আল-আম্মারি এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমি থেকে উঠে আসা মেধাবী মিডফিল্ডার জিদান ইকবাল। মাঠের মাঝখান থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে এই দুই মিডফিল্ডারের ভূমিকা ইরাকের প্রতিটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে ইরাক বেশ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করবে। তাদের গ্রুপ ‘আই’-তে আছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম ডার্ক হর্স হিসেবে পরিচিত সেনেগাল ও নরওয়ে। গ্রুপটি যে বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। তবে ইরাকের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা মনে করেন, বড় দলের বিপক্ষে খেলা তাদের আত্মবিশ্বাস ও অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। ১৬ জুন বোস্টনে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা। এরপর ২২ জুন ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে তারা এবং ২৬ জুন টরন্টোতে সেনেগালের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে। এই প্রতিটি ম্যাচই ইরাকের ফুটবলের ইতিহাসের নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে।
দলের কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডের বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা ইরাকি শিবিরের জন্য বড় শক্তি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার দায়িত্ব পালন করা এই অভিজ্ঞ কৌশলী ভালোভাবেই জানেন কিভাবে বড় টুর্নামেন্টে দলকে প্রস্তুত করতে হয়। তিনি এমন এক স্কোয়াড সাজিয়েছেন যেখানে প্রতিটি পজিশনে ব্যাকআপ খেলোয়াড় হিসেবেও মানসম্মত খেলোয়াড় রয়েছেন। গোলরক্ষক হিসেবে জালাল হাসান, ফাহাদ তালিব এবং আহমেদ বাসিলের মতো নির্ভরযোগ্যরা থাকছেন। রক্ষণে রেবিন সুলাকা, জাইদ তাহসিন ও হুসেন আলীদের নিয়ে গড়া রক্ষণভাগ কতটা শক্ত প্রাচীর তৈরি করতে পারে, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবল বিশ্ব।
ইরাকের এই বিশ্বকাপ যাত্রা কেবল মাঠের ফুটবল নয়, এটি একটি পুরো জাতির আবেগের প্রতিফলন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অতীত এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ইরাকি ফুটবলাররা যে অদম্য মানসিকতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বমঞ্চে ফিরে এসেছে, তা ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণার উৎস। মাঠে যখন তারা মেসোপটেমিয়ার সিংহের মতো গর্জে উঠবে, তখন পুরো ইরাকের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনও তাদের সাথে তাল মেলাবে। প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকেল এবং প্রতিটি গোল যেন সেই পুরনো হতাশার স্মৃতি মুছে ফেলে নতুন এক ইতিহাসের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে ইরাক এখন আর কেবল দর্শক নয়, তারা লড়াই করার মতো এক প্রতিপক্ষ। তরুণ খেলোয়াড়দের চোখে মুখে যে জয়ের নেশা এবং অভিজ্ঞদের কণ্ঠে যে দৃঢ়তার সুর, তা প্রমাণ করে যে ইরাক প্রস্তুত। বিশ্ববাসী দেখার অপেক্ষায় আছে, ইউরোপীয় ও এমএলএসের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই ইরাকি বাহিনী টুর্নামেন্টের ফেভারিটদের কতটা চাপে ফেলতে পারে। উত্তর আমেরিকার মাঠগুলোতে ইরাকের এই উত্থান বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, যখন বল গড়াবে মাঠের ঘাসে আর মেসোপটেমিয়ার সিংহরা বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে তাদের মিশন শুরু করবে।