প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের এক স্থানীয় নেতার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমানের বসতঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ঘরের মালামাল লুট এবং পরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
শুক্রবার (১৮ জুলাই) রাত ১২টার পর থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত উপজেলার কাঁঠালতলী বাজারসংলগ্ন উত্তর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কাজী মিজানুর রহমান মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে তাঁর পরিবর্তে ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।
পরিবারের অভিযোগ, মিজানুর রহমানের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে একদল লোক তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। মিজানুর রহমানের স্ত্রী মেহেরুন্নেছা শিল্পী অভিযোগ করেন, মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে পলাশ হাওলাদার এবং সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারের নেতৃত্বে প্রায় আড়াই শ মানুষ এ ঘটনায় অংশ নেয়।
তিনি জানান, বৃদ্ধা শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় তাঁরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এই সুযোগে গভীর রাতে বুলডোজার দিয়ে তাঁদের পাকা বসতঘর ভেঙে ফেলা হয়। ঘরের চারটি রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, এসি, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। এছাড়া ছয় কক্ষের ওই বাড়িটির আনুমানিক মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। ভাঙচুরের পর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
মেহেরুন্নেছা শিল্পী বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে শনিবার ভোরে তিনি ঢাকা থেকে বাড়িতে পৌঁছান। স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, হামলার আগে কাঁঠালতলী বাজার ও আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। কেউ ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তাঁদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁদের বাড়ির কাছেই কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। গভীর রাতে বুলডোজারের শব্দ শুনে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এলেও হামলাকারীদের চাপের মুখে সরে যেতে বাধ্য হন।
ঘটনার বিষয়ে মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুজ্জামান জানান, ভোররাতে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা মিজানুর রহমানের বসতঘরে আগুন দেয় এবং বেকু মেশিন দিয়ে বাড়ির একটি অংশ ভেঙে ফেলে। খবর পাওয়ার পর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়।
ওসি জানান, ঘরের ভেতরে কেউ না থাকায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মো. রাসেল জানান, ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। পরে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়িকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে তিনি অবগত নন। তাঁর দাবি, শুক্রবার তিনি ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মনির খন্দকার বলেন, মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ওই জমির বিষয়ে ভূমি অফিসে তথ্য রয়েছে। তবে নিজেরা বাড়ি ভাঙার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অতীতে বিএনপি প্রশাসন ব্যবহার করেনি।
মনির খন্দকার আরও বলেন, মিজানুর রহমান ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে অতীতে বিএনপি নেতাদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত, তা নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো ব্যক্তির বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ কারও নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পটুয়াখালীর এ ঘটনায় এখন নজর রয়েছে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তদন্ত শেষে হামলার প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার পেছনের বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।