প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ সাধারণত অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার লড়াই হিসেবেই বিবেচিত হয়। ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর তৃতীয় হওয়ার ম্যাচে মাঠে নামতে হয় দুই দলকে। তবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার এবারের লড়াই সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। মায়ামির মাঠে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়ে দুই দল উপহার দিয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড।
১০ গোলের এই মহারণে ব্যক্তিগত অর্জনের আলোও ছিল উজ্জ্বল। ইংল্যান্ডের বুকায়ো সাকা করেছেন দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। অন্যদিকে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে করেছেন জোড়া গোল। সেই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন ফরাসি এই তারকা। একই সঙ্গে গোল্ডেন বুটের লড়াইও আরও জমিয়ে তুলেছেন তিনি।
শিরোপার লড়াইয়ে থাকার লক্ষ্য নিয়েই বিশ্বকাপে এসেছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। কিন্তু সেমিফাইনালে হেরে যাওয়ার পর দুই দলের সামনে বাকি ছিল তৃতীয় স্থান অর্জনের সুযোগ। দুই দলের কোচই জানিয়েছিলেন, এমন ম্যাচে খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা কঠিন। তবুও মাঠে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ফাইনালের মতোই তীব্রতা, গতি এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়েছে দুই দল।
ইংল্যান্ডের প্রধান স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন, যিনি পুরো আসরে গোল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, এই ম্যাচে ছিলেন বেঞ্চে। ৬ গোল করা এই তারকা হয়তো বাইরে বসেই দেখেছেন সতীর্থদের গোল উৎসব। এমন একটি ম্যাচে মাঠে না থাকার আক্ষেপ তাঁর মনে থাকতেই পারে।
ম্যাচের শুরু থেকেই ইংল্যান্ড আক্রমণের ঝড় তোলে। মাত্র ২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে ডেকলান রাইসের দুর্দান্ত শটে গোলের সূচনা হয়। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর শক্তিশালী শট ফ্রান্সের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে। এরপর ১৮ মিনিটে এজরি কনসা হেড থেকে দ্বিতীয় গোল করেন।
এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেয় ইংল্যান্ড। বুকায়ো সাকা ৩৭তম মিনিটে প্রথম এবং যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে দ্বিতীয় গোল করে ফ্রান্সকে বড় চাপে ফেলে দেন। প্রথমার্ধ শেষে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-০। ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের দেখে মনে হচ্ছিল, সেমিফাইনালের হারের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দলটি।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। বিরতির পর মাঠে ফিরে ফ্রান্স দেখায় কেন তারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল। ৪৮তম মিনিটে মাইকেল ওলিসের দুর্দান্ত পাস থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পে গোল করে ব্যবধান কমান। তাঁর বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশিং ফ্রান্সকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেয়।
এই গোলের মাধ্যমে এমবাপ্পে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আরও এগিয়ে যান। এরপর ৫৪তম মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলা গোল করে ফ্রান্সকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসেন। ইংল্যান্ডের ৪-০ ব্যবধান তখন কমে দাঁড়ায় ৪-২।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে ৬৬তম মিনিটে। আবারও মাইকেল ওলিসের পাস থেকে গোল করেন এমবাপ্পে। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসিকে পেছনে ফেলেন তিনি। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২২টি, যা মেসির ২১ গোলকে ছাড়িয়ে যায়।
শুধু এমবাপ্পের রেকর্ড নয়, এই ম্যাচে মাইকেল ওলিসেও ইতিহাস গড়েছেন। তাঁর অ্যাসিস্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটিতে। এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড এখন তাঁর দখলে। এর আগে এই কীর্তি ছিল ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের। ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলে এক আসরে ছয়টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন।
ম্যাচের স্কোর যখন ৪-৩, তখন ইংল্যান্ড আবারও স্বস্তি ফিরে পায়। ৮৭তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন বুকায়ো সাকা। এই কীর্তির মাধ্যমে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় ইংলিশ খেলোয়াড় হন তিনি। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ফুটবলের কিংবদন্তি পেলের, যিনি ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।
শেষ মুহূর্তেও নাটকীয়তা থামেনি। ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে যোগ করা সময়ে গোল করে ব্যবধান কমান। তবে ইংল্যান্ডের জয় নিশ্চিত করতে আরও একটি গোল করেন বদলি হিসেবে মাঠে নামা জুড বেলিংহ্যাম। তাঁর গোলে শেষ পর্যন্ত ৬-৪ ব্যবধানে স্মরণীয় জয় পায় ইংল্যান্ড।
এই ম্যাচ শুধু দুই দলের তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করেনি, বরং বিশ্বকাপের রেকর্ড বইয়েও নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে এটি এখন সর্বোচ্চ গোলের ম্যাচ। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ১৯৫৮ বিশ্বকাপের ম্যাচে, যেখানে ফ্রান্স পশ্চিম জার্মানিকে ৬-৩ গোলে হারিয়েছিল।
ইংল্যান্ডের জন্য এই জয় গত ছয় দশকের মধ্যে বিশ্বকাপে অন্যতম বড় অর্জন। ১৯৬৬ সালের পর এবারই বিশ্বকাপে তাদের সেরা অবস্থান তৃতীয় স্থান। যদিও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তবে শেষটা তারা করেছে দুর্দান্ত এক জয়ে।
অন্যদিকে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের বিদায়টা সুখকর হয়নি। দীর্ঘ সময়ের দায়িত্ব শেষে তাঁর শেষ ম্যাচে পরাজয় এসেছে। তবে দলের কয়েকজন তারকা নিজেদের ব্যক্তিগত অর্জনের মাধ্যমে স্মরণীয় করে রেখেছেন এই আসর।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ম্যাচ খুব কমই দেখা যায়, যেখানে দলীয় ফলাফল, ব্যক্তিগত রেকর্ড এবং গোলের নাটকীয়তা একসঙ্গে মিলেছে। ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের এই ৬-৪ লড়াই তাই শুধু তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ নয়, বরং এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।