প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে দলীয় সাফল্য না পেলেও ব্যক্তিগত অর্জনে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন ফ্রান্সের তরুণ মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলেকে পেছনে ফেলে এক আসরে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপেকে দেওয়া দুই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে এই অনন্য কীর্তি গড়েন বায়ার্ন মিউনিখের এই তারকা।
বিশ্বকাপের সর্বশেষ দুই আসরের ফাইনালিস্ট হিসেবে এবারের আসরে অংশ নিয়েছিল ফ্রান্স। তবে শেষ পর্যন্ত শিরোপার লড়াইয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি তারা। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৬-৪ গোলে হেরে চতুর্থ স্থান নিয়েই টুর্নামেন্ট শেষ করেছে বর্তমান সময়ের অন্যতম শক্তিশালী দলটি। তবে বিদায়ের ম্যাচেও ফরাসি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত অর্জনের খাতা সমৃদ্ধ হয়েছে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধেই বড় ধাক্কা খায় ফ্রান্স। মাত্র ৪৫ মিনিটে ৪ গোল হজম করে তারা। দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে ফরাসিরা এবং দুই গোল পরিশোধ করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয়। যদিও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি দলটি। তবে এই ম্যাচেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ডের জন্ম দেন মাইকেল ওলিসে।
ম্যাচের ৪৮তম মিনিটে ওলিসের নিখুঁত পাস থেকে গোল করেন কিলিয়ান এমবাপে। এরপর ৬৬তম মিনিটে আবারও তাঁর তৈরি করা সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ফরাসি অধিনায়ক। মাত্র ১৮ মিনিটের ব্যবধানে দুটি অ্যাসিস্ট করে ওলিসে পৌঁছে যান ইতিহাসের অনন্য উচ্চতায়।
এর আগে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড ছিল ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের দখলে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে নয়, বরং ব্রাজিলের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের অভিযানে পেলে এক আসরে ৬টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন বলে রেকর্ডে উল্লেখ রয়েছে। দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে থাকা সেই রেকর্ড এবার ভেঙে দিলেন ওলিসে। চলতি বিশ্বকাপে তাঁর অ্যাসিস্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭টি।
ওলিসের এই সাফল্যের আরও একটি বিশেষ দিক রয়েছে। তাঁর দেওয়া ৭টি অ্যাসিস্টের মধ্যে ৫টি থেকেই গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপে। একই টুর্নামেন্টে নির্দিষ্ট দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে এত বেশি গোল-অ্যাসিস্ট সমন্বয়ের রেকর্ডও এটি। অর্থাৎ ওলিসে ও এমবাপের জুটি এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণভাগের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
যদিও ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি, তবুও ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে উজ্জ্বল ছিলেন ওলিসে। মাত্র ২৪ বছর বয়সী এই ফুটবলার বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নিজের সৃজনশীলতা, পাসিং দক্ষতা এবং আক্রমণ তৈরির ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁর পারফরম্যান্স ভবিষ্যতে ফ্রান্সের জাতীয় দলের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
তবে এই বিশ্বকাপে একটি অপ্রত্যাশিত রেকর্ডেও নাম লিখিয়েছেন ওলিসে। পুরো টুর্নামেন্টে ২০টি শট নিয়েও কোনো গোল করতে পারেননি তিনি। বিশ্বকাপের এক আসরে গোল না পাওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ শট নেওয়ার তালিকায় এখন তিনি যৌথভাবে শীর্ষে। এর আগে ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিও ২০টি শট নিয়েও গোলের দেখা পাননি।
ফুটবলে সাধারণত গোল ও গোলদাতাদের নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। তবে একটি দলের আক্রমণ গড়ে তোলা, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা থাকে সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়দের। ওলিসের এবারের পারফরম্যান্স সেই বিষয়টিই আবারও সামনে এনেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে পেলের মতো কিংবদন্তির রেকর্ড ভাঙা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই বিশেষ অর্জন। কারণ ব্রাজিলের এই ফুটবল সম্রাট শুধু একজন অসাধারণ গোলদাতা ছিলেন না, বরং দলকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সৃজনশীল ভূমিকাও ছিল অনন্য। দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা সেই রেকর্ড নিজের করে নিয়ে ওলিসে বিশ্ব ফুটবলে নতুন পরিচিতি পেয়েছেন।
অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপেও ব্যক্তিগতভাবে স্মরণীয় এক বিশ্বকাপ শেষ করেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তাঁর গোলসংখ্যা আরও বাড়ে। একই ম্যাচে ওলিসের অ্যাসিস্ট তাঁকে গোলের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতেও সহায়তা করেছে।
ফ্রান্সের জন্য এবারের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে হতাশা দিয়ে। তবে দলের তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের জন্য আশার বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে মাইকেল ওলিসের মতো প্রতিভাবান ফুটবলার বিশ্বমঞ্চে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন।
বিশ্বকাপের রেকর্ড বইয়ে নতুন অধ্যায় যোগ করে ওলিসে প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে শুধু গোল করাই ইতিহাস গড়ার একমাত্র পথ নয়। কখনো কখনো একটি নিখুঁত পাস, একটি সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সতীর্থকে গোলের সুযোগ করে দেওয়াও একজন খেলোয়াড়কে অমর করে রাখতে পারে।