প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামে চলতি মৌসুমের ভয়াবহ বন্যা কৃষি ও মৎস্য খাতকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অতিভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল, সবজিক্ষেত, মাছের খামার, পানের বরজ ও প্রাণিসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন, বিনিয়োগ ও পরিশ্রম মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা সরকারি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন সহায়তা। কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত সহায়তা না পেলে আগামী মৌসুমের আবাদও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার মতো চন্দনাইশ, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা এলাকায় বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি ও টানা বৃষ্টির কারণে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় আউশ ধান, মৌসুমি সবজি, আমনের বীজতলা, আদা, হলুদ এবং পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের অনেকেই ঋণ নিয়ে কিংবা দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ভেঙে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানি তাদের সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলার শঙ্খ নদের চরাঞ্চলের কৃষক মোহাম্মদ হাসান চলতি মৌসুমে প্রায় পাঁচ কানি জমিতে ঢ্যাঁড়শ, লাউ, ঝিঙা, চিচিঙ্গাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করেছিলেন। নিজের ৫০ হাজার টাকার পাশাপাশি স্থানীয় সমবায় সমিতি থেকে উচ্চ সুদে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকার বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে পুরো ক্ষেত তলিয়ে যায়। পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা যায় অধিকাংশ সবজি পচে নষ্ট হয়ে গেছে, আর যেগুলো কিছুটা টিকে ছিল সেগুলোও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এখন ঋণের কিস্তি, সংসারের ব্যয় এবং আগামী মৌসুমের আবাদ—সবকিছু নিয়েই চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।
মোহাম্মদ হাসান বলেন, শঙ্খচরের সবজি চাষই তাঁর পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। সেই ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। তাঁর ভাষায়, সরকারি সহায়তা ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোনো পথ তিনি দেখছেন না।
একইভাবে বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র মৎস্যচাষি মওলানা মো. হামিদের অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে কয়েকটি পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলেন। নিজের সাত লাখ টাকার পাশাপাশি সমবায় সমিতি ও একটি এনজিও থেকে আরও আট লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি রুই, কাতলা, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ শুরু করেন। মাছগুলো যখন বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই বন্যার পানিতে পুকুর ডুবে গিয়ে সব মাছ ভেসে যায়। ফলে কয়েক মাসের পরিশ্রমের পাশাপাশি পুরো বিনিয়োগই প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
মওলানা হামিদ জানান, মাছ বিক্রির আয় দিয়েই তাঁর সংসার চলত এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ হতো। এখন সব মাছ হারিয়ে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। কীভাবে ঋণ শোধ করবেন এবং পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জেলার মোট ১৬ হাজার ২৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সবজি ও আউশ ধানের আবাদে। জেলার প্রায় ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হওয়ায় প্রায় ৪৩ হাজার ৫০ টন উৎপাদন কমেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রায় ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদা উৎপাদনে প্রায় ৫২০ টন ক্ষতি হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। হলুদের প্রায় ১১৮ দশমিক ৩৬ টন উৎপাদন নষ্ট হয়ে প্রায় ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৭৮ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতির ফলে স্থানীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
শুধু কৃষি নয়, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতেও বন্যার প্রভাব ছিল ভয়াবহ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যায় প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি গবাদিপশু, হাঁস ও মুরগি মারা গেছে। এতে প্রায় ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার ৯৯১টি খামার বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৬ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে ৭ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ। অতিভারী এই বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, সবজিক্ষেত, মাছের প্রজেক্ট, পোল্ট্রি ফার্ম এবং পানের বরজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫১১ জন কৃষক। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরও বেশি, যা প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ জন। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, দুর্যোগটি শুধু কৃষি নয়, সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন না করা হলে আগামী আমন ও রবি মৌসুমের উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। অনেক কৃষকই ইতোমধ্যে ঋণের বোঝায় জর্জরিত। ফলে নতুন করে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ কেনার সক্ষমতা তাদের নেই। এ অবস্থায় সহজ শর্তে কৃষিঋণ, বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ, ক্ষুদ্র মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানিয়েছেন, শুধু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কৃষি খাতেই প্রায় ৩০৯ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন তিন পার্বত্য জেলাসহ অন্যান্য এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ চলছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের কৃষির জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার মাত্রা বাড়তে থাকায় কৃষকদের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি এবং কৃষি বীমার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ কৃষক ঘুরে দাঁড়াতে পারলে তবেই খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং দেশের কৃষি অর্থনীতি আবারও স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে পারবে।