গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমে শিল্পে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাস–সংকট দেশের শিল্প খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানিমুখী শিল্প থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য, কাচ, সিরামিক, ইস্পাত, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্প—প্রায় সব খাতেই উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক কারখানা উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে এবং সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করেছে। শিল্পমালিকেরা আশঙ্কা করছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে অবস্থিত মিতালি ফ্যাশনের ডাইং বিভাগ গত আট দিন ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কাপড় রং করার কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ৩০টি সেলাই লাইনের মধ্যে ১৮টি অলস পড়ে আছে। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পোশাক সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ বলেন, ডাইং কার্যক্রম বন্ধ থাকলে পরবর্তী উৎপাদন ধাপগুলোও স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় না। কয়েকটি রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা না গেলে ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ফলে অনেক কারখানা তাদের সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করতে পারছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পকারখানাগুলোর গড় উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।

বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে ডাইং ও ওয়াশিং ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ থাকায় সেলাই বিভাগেও কাজের গতি কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করেছে।

ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, গ্যাস ছাড়া ডাইং কারখানা চালানো সম্ভব নয়। তাই ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির সঙ্গে আরও কয়েক দিন ছুটি বাড়ানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে উৎপাদন আবার আগের অবস্থায় ফিরবে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ পোশাক কারখানা মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। অতীতে সিলিন্ডারের মাধ্যমে বিকল্প গ্যাস সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে সেটিও বন্ধ রয়েছে। ফলে সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে কোহিনূর কেমিক্যাল দিনে দুই শিফটে ১৬ ঘণ্টা উৎপাদন চালালেও বর্তমানে দিনের বেলায় কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। রাতের দিকে সামান্য গ্যাসের চাপ বাড়লে সীমিত পরিসরে উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে সাবান, ডিটারজেন্ট ও প্রসাধনী উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ব্র্যান্ড) গোলাম কিবরিয়া সরকার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় আগেই বেড়েছে। তার ওপর গ্যাস–সংকট উৎপাদন ব্যাহত করায় বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না এবং প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি লোকসান গুনতে হচ্ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ জানিয়েছে, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পপার্কে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে। গ্যাসের অভাবে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পল্লী বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে সীমিত উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এর ফলে প্লাস্টিক পণ্য, বিস্কুট, বেকারি ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়ছে।

বস্ত্র খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলসের দৈনিক ২৪ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১০ হাজার পাউন্ডে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, এভাবে উৎপাদন চলতে থাকলে প্রতি মাসে কোটি টাকার কাছাকাছি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী শিল্পগুলোর পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। কাচশিল্পে একবার চুল্লি বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চট্টগ্রামের পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন বলেন, বর্তমানে গ্যাসের চাপ নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে যাচ্ছে। চুল্লি ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন করে স্থাপন করতে হবে, যা শিল্পের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি।

ইস্পাত শিল্পও একই ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল ব্যবহার করে অল্প সময় উৎপাদন চালানো গেলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দীর্ঘ সময় এভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সিরামিক শিল্প মালিকদের সংগঠনও জানিয়েছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভালুকা ও ত্রিশালের প্রায় ২০টি কারখানায় গ্যাসের চাপ অনেক সময় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন। গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। অথচ দেশের মোট দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল আংশিক চালু হলে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের শিল্পখাত দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়া এবং ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পখাতকে ধীরে ধীরে একক জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বের করে বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে হবে।

শিল্পমালিকদের মতে, দ্রুত এলএনজি টার্মিনাল সচল করা, শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু শিল্পকারখানাই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত