প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কোপা দো ব্রাজিলের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দের রাত শেষ পর্যন্ত বিতর্কে রূপ নিয়েছে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের জন্য। রেমোকে হারিয়ে সান্তোস শেষ আটে জায়গা করে নিলেও ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার পথে প্রতিপক্ষ দলের কর্মকর্তা ও সমর্থকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্রাজিলের ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
মঙ্গলবার মাঙ্গেইরাও স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে রেমোকে ১-০ গোলে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে সান্তোস। ম্যাচের ফলাফল সান্তোসের পক্ষে গেলেও শেষ মুহূর্তের ঘটনাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
সাংবাদিক ব্রেনো রাইওলের ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে নেইমার রেমোর প্রতিনিধিদলের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। তবে ঠিক কোন বিষয় থেকে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির শুরু, তা পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাচের ফলাফল উদ্যাপন করার সময় নেইমারের কিছু আচরণকে উসকানিমূলক হিসেবে নিয়েছিলেন রেমোর সমর্থকেরা। তাঁদের দুয়ো ও বিদ্রূপের জবাবে নেইমারও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। কয়েকবার তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘বাদ পড়েছ’। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি রেমোর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিপক্ষকে কটাক্ষ করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নেইমার শুধু কথার মাধ্যমে নয়, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও নিজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে নাচতে এবং জিহ্বা বের করে বিদ্রূপ করতে দেখা যায়। তাঁর এমন আচরণ রেমোর খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের আরও উত্তেজিত করে তোলে।
পরিস্থিতির একপর্যায়ে রেমোর প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য নেইমারের দিকে পাল্টা গালাগালি করেন। কয়েক মুহূর্ত ধরে চলা এই বাক্বিতণ্ডা থামাতে দুই দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও কর্মকর্তারা এগিয়ে আসেন। ড্রেসিংরুমের করিডোরে তৈরি হয় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি।
ঘটনার সময় সান্তোসের আরেক পরিচিত ফুটবলার গাবিগোলকেও দেখা যায়। তিনি দূর থেকে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং নেইমারকে ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
তবে উত্তেজনা শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রেমোর কিছু সমর্থক ও কর্মকর্তা নিরাপত্তাবেষ্টনীর অংশ ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এরপর সান্তোসের নিরাপত্তাকর্মীরা ড্রেসিংরুম এলাকার সামনে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
ঘটনার পর নেইমারের সমালোচনা করেছেন রেমোর সভাপতি আন্তোনিও কার্লোস তেইশেইরা, যিনি ফুটবল অঙ্গনে ‘তোনিয়াও’ নামে পরিচিত। এক ভিডিও বার্তায় তিনি নেইমারের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, সান্তোসের মতো বড় একটি দলের এমন আচরণের প্রয়োজন ছিল না। নেইমারের মতো একজন খেলোয়াড়, যাকে অনেক তরুণ ফুটবলার আদর্শ হিসেবে দেখে, তাঁর কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তোনিয়াও আরও বলেন, একজন তারকা খেলোয়াড়ের দায়িত্ব শুধু মাঠে ভালো খেলা নয়, বরং নিজের আচরণের মাধ্যমেও উদাহরণ তৈরি করা। তাঁর মতে, নেইমারের মতো জনপ্রিয় খেলোয়াড়ের কাছ থেকে আরও সংযত আচরণ প্রত্যাশা করেন সমর্থকেরা।
তবে ম্যাচের পুরো সময়জুড়েই নেইমারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ম্যাচ শুরুর আগে বেঞ্চে থাকা অবস্থায়ও রেমোর সমর্থকেরা তাঁকে লক্ষ্য করে দুয়ো দেন। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার পরও তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ চলতে থাকে।
এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও মাঠে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেন নেইমার। সান্তোসের জয়সূচক গোলের পেছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া বল থেকেই রনি রুস্তিকো গোল করে দলকে জয় এনে দেন।
নেইমারের ক্যারিয়ারে মাঠের বাইরের বিতর্ক নতুন নয়। প্রতিভা, সাফল্য ও বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁর আবেগপ্রবণ আচরণ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কখনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত, কখনো মাঠের প্রতিক্রিয়া—এসব কারণে তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
তবে সমর্থকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, নেইমারের আবেগই তাঁর খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। চাপের মুহূর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার প্রবণতা যেমন তাঁকে অনেক সময় সমালোচনার মুখে ফেলে, তেমনি মাঠে তাঁর লড়াইয়ের মানসিকতাও অনেকের কাছে প্রশংসনীয়।
সান্তোসের জন্য এই জয় অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। কোপা দো ব্রাজিলের মতো প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নেইমারের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দলের জন্য বড় শক্তি। কিন্তু মাঠের বাইরের এমন ঘটনা দলের ভাবমূর্তিতে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
শেষ পর্যন্ত রেমোর বিপক্ষে জয় সান্তোসকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছে, কিন্তু ম্যাচ-পরবর্তী নেইমারের আচরণই সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছে। ফুটবল মাঠে তারকা খেলোয়াড়দের প্রতিটি আচরণ যেমন কোটি দর্শকের নজরে থাকে, তেমনি তাঁদের দায়িত্বশীলতার প্রশ্নও সামনে আসে বারবার।